সরকারের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আওতায় চলতি বছর সিরাজগঞ্জে ৪০ হাজারের বেশি গাছ লাগানোর লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। তবে রোপণের এক থেকে দেড় মাসের মধ্যেই নিয়মিত পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক চারা মারা গেছে। একই সঙ্গে জেলার কয়েকটি ইউনিয়নের নথিপত্রে বাজারমূল্যের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি দামে গাছ কেনা ও রোপণের ব্যয় দেখানোর তথ্য পাওয়া গেছে।
জেলা প্রশাসনের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে এসব গাছ লাগানো হচ্ছে। ইউনিয়ন পরিষদের নথিতে চারা কেনা ও রোপণের পাশাপাশি বাঁশের খুঁটি, বেড়া, পানি দেওয়া এবং রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে রোপণের পর এসব কার্যক্রমের দৃশ্যমান প্রমাণ তেমন পাওয়া যায়নি।
উল্লাপাড়া উপজেলার উধুনিয়া ইউনিয়নে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির ব্যয়ে অসঙ্গতির তথ্য পাওয়া গেছে। ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এ কর্মসূচির জন্য ১ লাখ ৮৭ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ওই অর্থে ৪৬৯টি গাছ লাগানো হয়েছে। সে হিসাবে প্রতি গাছের পেছনে ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৩৯৯ টাকা।
তবে স্থানীয় একাধিক নার্সারি মালিক জানান, এসব প্রজাতির চারা তারা ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি করেন। সে হিসাবে উধুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের দেখানো ব্যয় স্থানীয় বাজারদরের তুলনায় প্রায় সাত থেকে আট গুণ বেশি।
পাশের রায়গঞ্জ উপজেলার ঘুড়কা ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, তাদের ইউনিয়নে ১ হাজার ৮০০টি গাছ লাগানো হয়েছে। প্রতি গাছে ৬৫ থেকে ৭০ টাকা করে খরচ হয়েছে বলেও জানান তিনি।
উধুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা শামসুল আলম বলেন, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির ব্যয়ের প্রাক্কলন উপজেলা এলজিইডি কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী আলমগীর হোসেন তৈরি করেছেন। সেখানে প্রতি গাছের জন্য প্রায় ৪০০ টাকা করে ব্যয় ধরা হয়েছে। এর মধ্যে পরিচর্যা ও বাঁশের খুঁটির খরচও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
লাগানোর পরই মরছে চারা
উধুনিয়ার বাংলাপাড়া সড়কের একটি অংশ ঘুরে দেখা যায়, সেখানে লাগানো প্রায় ২০০টি গাছের মধ্যে অন্তত ৫০টি পুরোপুরি মারা গেছে। আরও কয়েকটি চারা মুমূর্ষু অবস্থায় রয়েছে। অনেক জীবিত চারাও শুকিয়ে গেছে। কিছু গাছ পড়ে গেছে কিংবা হেলে রয়েছে।
চারাগুলোর আশপাশে নিয়মিত পানি দেওয়ার দৃশ্যমান কোনো চিহ্নও দেখা যায়নি। অধিকাংশ গাছে গবাদিপশু ও মানুষের চলাচল থেকে রক্ষার জন্য বাঁশের খুঁটি বা বেড়াও ছিল না। ফলে রোপণের পরপরই অনেক চারা শুকিয়ে কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, গাছগুলোর দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের তারা নিয়মিত পরিচর্যা করতে দেখেননি। নিয়মিত পানি দেওয়া ও সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হলে অনেক চারাই বেঁচে থাকত বলে মনে করেন তারা।
ব্যয়ের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন
উধুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য বিউটি খাতুনকে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সভাপতি করা হয়েছে। তিনি পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হওয়ায় তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তার স্বামী মঈনুল হোসেন বলেন, তার স্ত্রীকে প্রকল্পের সভাপতি করা হয়েছে বলে তিনি শুনেছেন। তবে কোথা থেকে গাছ কেনা হয়েছে বা কত টাকা খরচ হয়েছে, সে বিষয়ে তাকে কিছু জানানো হয়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির প্রাক্কলন ও ব্যয়ের হিসাব তৈরির সঙ্গে উপজেলা এলজিইডি কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী এবং সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের কর্মকর্তারা যুক্ত ছিলেন। স্থানীয় লোকজন প্রকৃত বাজারদরের তুলনায় ব্যয় বেশি দেখানোর অভিযোগ করেছেন।
এ বিষয়ে জানতে উপসহকারী প্রকৌশলী আলমগীর হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব তহবিল থেকে বিভিন্ন ইউনিয়নে গাছ লাগানো হচ্ছে। তবে রোপণের পর চারাগুলোর বেঁচে থাকা নিশ্চিত করা, নিয়মিত পরিচর্যা এবং বরাদ্দের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্টিমেটে পরিচর্যার ব্যয় থাকার দাবি
এলজিইডির উল্লাপাড়া উপজেলা প্রকৌশলী মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ইউনিয়ন পরিষদে বৃক্ষরোপণের বরাদ্দের জন্য এলজিইডির উপসহকারীরা যে স্টিমেট করেছেন, সেখানে একটি গাছের দাম, রোপণ, বেড়া এবং পরিচর্যার ব্যয় ধরা হয়েছে।
তবে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা প্রশাসক ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল কাদের বিশ্বাসের বক্তব্যের সঙ্গে ইউপি প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও এলজিইডির স্টিমেটের মধ্যে অসঙ্গতি দেখা গেছে।
কাদের বিশ্বাস বলেন, গাছ লাগানোর জন্য টাকা বরাদ্দ রয়েছে, কিন্তু পরিচর্যা ও গাছের আনুষঙ্গিক কোনো খরচের বরাদ্দ নেই। এ কারণে গাছের পরিচর্যা করা হয়নি।
পরিচর্যার অভাবে গাছ মারা যাওয়ার বিষয়ে উল্লাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রায়হানুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি দেখভালের দায়িত্ব ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও প্রশাসক/চেয়ারম্যানের। তারা দায়িত্বে অবহেলা করলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সাধারণ) গণপতি রায় বলেন, বৃক্ষরোপণ প্রকল্পটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং গুরুত্ব দিয়ে এটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তবে প্রকল্পটি এখনও শেষ হয়নি। জেলার বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর গাছ লাগাচ্ছে।
গাছ পরিচর্যার অভাবে মারা যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সব জায়গায় গাছ মারা যাচ্ছে—বিষয়টি এমন নয়। জেলার কয়েকটি সড়কে ইতোমধ্যে গাছ দৃশ্যমান হয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে নজরদারি আরও বাড়ানো হবে।

অনলাইন ডেস্ক 


















