ঢাকা শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ময়মনসিংহে বাসচাপায় নিহত ৭ জনের দাফন সম্পন্ন

blank

চারটি খাটিয়া, সারি সারি নতুন কবর আর স্বজনদের বুকফাটা আহাজারি—সব মিলিয়ে জামালপুরের কয়েকটি গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। ময়মনসিংহে রাজীব পরিবহনের বাসচাপায় অটোরিকশাচালকসহ নিহত সাতজনের দাফন সম্পন্ন হয়েছে নিজ নিজ গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে। নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের চার সদস্য থাকায় শোকের মাত্রা আরও ভারী হয়ে উঠেছে। প্রিয়জনদের হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন স্বজনেরা; শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েছে পুরো এলাকা।

শুক্রবার (২ অক্টোবর) দুপুরে ময়মনসিংহ নগরীর আকুয়া বাইপাস এলাকায় রাজীব পরিবহনের একটি দ্রুতগতির যাত্রীবাহী বাসের চাপায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকসহ সাতজন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ছয়জনের বাড়ি জামালপুর সদর উপজেলার রানাগাছা ইউনিয়নে। তাঁদের চারজন একই পরিবারের সদস্য। নিহত অন্য দুজন স্বামী-স্ত্রী এবং অপরজন অটোরিকশাচালক।

শুক্রবার রাতেই সদর উপজেলার রানাগাছা ইউনিয়নের বীর গোবিন্দী গ্রামে অটোরিকশাচালক সুজন মিয়ার জানাজা শেষে তাঁকে দাফন করা হয়। শনিবার (৩ অক্টোবর) সকাল ৯টায় একই ইউনিয়নের ঘোড়াকান্দা গ্রামে নিহত অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূ মর্জিনা বেগম (২৫) ও তাঁর পাঁচ বছর বয়সী ছেলে মিনালের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে স্থানীয় কবরস্থানে তাঁদের দাফন করা হয়।

সকাল ১০টায় দড়িহামিদপুর ভাটিপাড়া গ্রামে মর্জিনার বাবা মোফাজ্জল হোসেন লেবু (৫৫) ও তাঁর ৮৫ বছর বয়সী দাদি রাশিদা বেগমের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে তাঁদের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। পরে শরিফপুর ইউনিয়নের বাদেচান্দি গ্রামে নিহত দম্পতি আকরাম আলী ও তাঁর স্ত্রী মমতা বেগমের জানাজা শেষে তাঁদেরও পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

নিহতদের স্বজনেরা জানান, পেশায় রাজমিস্ত্রি মোফাজ্জল হোসেন লেবু স্ত্রী ও এক সন্তানকে নিয়ে গাজীপুরের হুতাপাড়া এলাকায় বসবাস করতেন। তাঁর মা, অন্তঃসত্ত্বা মেয়ে ও নাতিকে নিজের কাছে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বৃহস্পতিবার তিনি গ্রামের বাড়িতে এসেছিলেন। শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তাঁদের নিয়ে নান্দিনা থেকে অটোরিকশায় ময়মনসিংহের উদ্দেশে রওনা হন তিনি। সেখান থেকে বাসে করে গাজীপুরে যাওয়ার কথা ছিল তাঁদের। কিন্তু আকুয়া বাইপাস এলাকায় পৌঁছানোর পর বাসের চাপায় তাঁদের সেই যাত্রাই শেষ হয়ে যায়।

একসঙ্গে পরিবারের চার সদস্যকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন স্বজনেরা। মোফাজ্জলের স্বজন ইসমতারা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, সবাইকে সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়ার জন্য লেবু বাড়িতে এসেছিলেন। কিন্তু এক মুহূর্তেই তাঁদের পরিবারটি নিঃস্ব হয়ে গেল।

স্থানীয় বাসিন্দা আজাদ ফারাজি বলেন, টেলিভিশনে বহুবার সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যুর খবর দেখেছেন। কিন্তু এবার নিজের গ্রামের চারজনসহ একসঙ্গে এত মানুষের মৃত্যু পুরো এলাকাকে শোকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।

নিহতদের জানাজায় অংশ নিয়ে গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেন জামালপুর-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শাহ মোহাম্মদ ওয়ারেছ আলী মামুন। তিনি বলেন, শোকাহত পরিবারগুলোর পাশে সব ধরনের সহায়তা নিয়ে দাঁড়ানো হবে। ভবিষ্যতে সড়কে এ ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা রোধে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, গত ২০ মাসে রাজীব পরিবহনের বাসের কারণে অন্তত নয়টি পৃথক দুর্ঘটনায় ১৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। পাশাপাশি দায়ী বাসচালক ও পরিবহন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এবং সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী ও নিহতদের স্বজনেরা।

জনপ্রিয় খবর
blank

বাগেরহাটে দুই মোটরসাইকেল ও নসিমনের ত্রিমুখী সংঘর্ষে,নিহত ৩

ময়মনসিংহে বাসচাপায় নিহত ৭ জনের দাফন সম্পন্ন

প্রকাশের সময় : ১০ ঘন্টা আগে
blank

চারটি খাটিয়া, সারি সারি নতুন কবর আর স্বজনদের বুকফাটা আহাজারি—সব মিলিয়ে জামালপুরের কয়েকটি গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। ময়মনসিংহে রাজীব পরিবহনের বাসচাপায় অটোরিকশাচালকসহ নিহত সাতজনের দাফন সম্পন্ন হয়েছে নিজ নিজ গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে। নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের চার সদস্য থাকায় শোকের মাত্রা আরও ভারী হয়ে উঠেছে। প্রিয়জনদের হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন স্বজনেরা; শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েছে পুরো এলাকা।

শুক্রবার (২ অক্টোবর) দুপুরে ময়মনসিংহ নগরীর আকুয়া বাইপাস এলাকায় রাজীব পরিবহনের একটি দ্রুতগতির যাত্রীবাহী বাসের চাপায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকসহ সাতজন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ছয়জনের বাড়ি জামালপুর সদর উপজেলার রানাগাছা ইউনিয়নে। তাঁদের চারজন একই পরিবারের সদস্য। নিহত অন্য দুজন স্বামী-স্ত্রী এবং অপরজন অটোরিকশাচালক।

শুক্রবার রাতেই সদর উপজেলার রানাগাছা ইউনিয়নের বীর গোবিন্দী গ্রামে অটোরিকশাচালক সুজন মিয়ার জানাজা শেষে তাঁকে দাফন করা হয়। শনিবার (৩ অক্টোবর) সকাল ৯টায় একই ইউনিয়নের ঘোড়াকান্দা গ্রামে নিহত অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূ মর্জিনা বেগম (২৫) ও তাঁর পাঁচ বছর বয়সী ছেলে মিনালের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে স্থানীয় কবরস্থানে তাঁদের দাফন করা হয়।

সকাল ১০টায় দড়িহামিদপুর ভাটিপাড়া গ্রামে মর্জিনার বাবা মোফাজ্জল হোসেন লেবু (৫৫) ও তাঁর ৮৫ বছর বয়সী দাদি রাশিদা বেগমের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে তাঁদের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। পরে শরিফপুর ইউনিয়নের বাদেচান্দি গ্রামে নিহত দম্পতি আকরাম আলী ও তাঁর স্ত্রী মমতা বেগমের জানাজা শেষে তাঁদেরও পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

নিহতদের স্বজনেরা জানান, পেশায় রাজমিস্ত্রি মোফাজ্জল হোসেন লেবু স্ত্রী ও এক সন্তানকে নিয়ে গাজীপুরের হুতাপাড়া এলাকায় বসবাস করতেন। তাঁর মা, অন্তঃসত্ত্বা মেয়ে ও নাতিকে নিজের কাছে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বৃহস্পতিবার তিনি গ্রামের বাড়িতে এসেছিলেন। শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তাঁদের নিয়ে নান্দিনা থেকে অটোরিকশায় ময়মনসিংহের উদ্দেশে রওনা হন তিনি। সেখান থেকে বাসে করে গাজীপুরে যাওয়ার কথা ছিল তাঁদের। কিন্তু আকুয়া বাইপাস এলাকায় পৌঁছানোর পর বাসের চাপায় তাঁদের সেই যাত্রাই শেষ হয়ে যায়।

একসঙ্গে পরিবারের চার সদস্যকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন স্বজনেরা। মোফাজ্জলের স্বজন ইসমতারা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, সবাইকে সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়ার জন্য লেবু বাড়িতে এসেছিলেন। কিন্তু এক মুহূর্তেই তাঁদের পরিবারটি নিঃস্ব হয়ে গেল।

স্থানীয় বাসিন্দা আজাদ ফারাজি বলেন, টেলিভিশনে বহুবার সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যুর খবর দেখেছেন। কিন্তু এবার নিজের গ্রামের চারজনসহ একসঙ্গে এত মানুষের মৃত্যু পুরো এলাকাকে শোকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।

নিহতদের জানাজায় অংশ নিয়ে গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেন জামালপুর-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শাহ মোহাম্মদ ওয়ারেছ আলী মামুন। তিনি বলেন, শোকাহত পরিবারগুলোর পাশে সব ধরনের সহায়তা নিয়ে দাঁড়ানো হবে। ভবিষ্যতে সড়কে এ ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা রোধে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, গত ২০ মাসে রাজীব পরিবহনের বাসের কারণে অন্তত নয়টি পৃথক দুর্ঘটনায় ১৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। পাশাপাশি দায়ী বাসচালক ও পরিবহন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এবং সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী ও নিহতদের স্বজনেরা।