দুর্দশার খবর প্রকাশের পর ১ লাখ ৪০ হাজার টাকায় নির্মিত হলো বাবা-ছেলের নতুন ঘর
ঝড়-বৃষ্টিতে পলিথিনের ছাউনি উড়ে যেত, বৃষ্টির পানি গড়িয়ে পড়ত চৌকিতে। তীব্র রোদে উত্তপ্ত হয়ে উঠত আশ্রয়টুকু। সেই পলিথিনের নিচেই দিনের পর দিন কেটে যাচ্ছিল বৃদ্ধ কফিল প্রামাণিক (৭০) ও তাঁর দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছেলে আসমত প্রামাণিকের (৫২) জীবন।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তাঁদের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরে প্রতিবেদন প্রকাশের পর অবশেষে বদলে গেছে বাবা-ছেলের সেই জীবন। পলিথিনের ছাউনি ছেড়ে এবার মাথার ওপর উঠেছে টিনের নতুন ছাদ। ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে তাঁদের জন্য একটি নতুন ঘর।
শুক্রবার বিকেলে নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার জোনাইল ইউনিয়নের মানইর গ্রামে আনুষ্ঠানিকভাবে বাবা-ছেলের হাতে নতুন ঘরের চাবি তুলে দেন স্থানীয় সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ।
জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে মানইর গ্রামের রাস্তার পাশে পলিথিন টাঙিয়ে কোনোরকমে দিন কাটছিল কফিল ও আসমতের। প্যারালাইজড হয়ে চলাফেরায় অক্ষম কফিলের নিজের কোনো ঘরবাড়ি ছিল না। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছেলে আসমতই ছিলেন তাঁর একমাত্র ভরসা।

জন্মান্ধ না হলেও পরে পোলিও রোগে দৃষ্টিশক্তি হারান আসমত। একসময় স্ত্রী ও এক মেয়েকে নিয়ে তাঁর সংসার ছিল। প্রায় সাত-আট বছর আগে স্ত্রী তাঁকে ছেড়ে চলে যান। পরে মেয়েটিও মারা যান। এরপর নিজের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতার মধ্যেই বাবার দেখভালের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন আসমত। বাবার খাবারের সংস্থান করতে তাঁকে মানুষের দ্বারে দ্বারে সাহায্য চাইতে হতো।
তাঁদের দিন-রাত কাটত অনিশ্চয়তায়। বর্ষায় বৃষ্টির পানি পলিথিনের ফাঁক দিয়ে চৌকিতে পড়ত। ঝড় এলে উড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকত ছাউনিটি। আর তীব্র রোদে পলিথিনের নিচে থাকা হয়ে উঠত কষ্টকর। এক খণ্ড জমি থাকলেও সেখানে একটি নিরাপদ ঘর নির্মাণের সামর্থ্য ছিল না তাঁদের।
অভাবের সংসারে যেখানে প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করাই কঠিন, সেখানে স্থায়ী একটি ঘর ছিল কফিল ও আসমতের কাছে অনেকটা স্বপ্নের মতো।
সেই স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে আসে ঢাকাস্থ বড়াইগ্রাম উপজেলা সমিতি ও উপজেলা প্রশাসন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বাবা-ছেলের মানবেতর জীবনযাপনের খবর প্রকাশের পর বিষয়টি তাঁদের নজরে আসে। পরে তাঁদের উদ্যোগে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় নতুন ঘরটি।
শুক্রবার বিকেলে চাবি হস্তান্তর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ বাবা-ছেলের পানির সমস্যা সমাধানে একটি বিদ্যুৎচালিত পাম্প দেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দেন। একই সঙ্গে তাঁদের দুর্দশার চিত্র গণমাধ্যমে তুলে ধরায় সংবাদকর্মীদের এবং নিজেদের অর্থায়নে ঘর নির্মাণে এগিয়ে আসা ব্যক্তিদের ধন্যবাদ জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ঢাকাস্থ বড়াইগ্রাম উপজেলা সমিতির সভাপতি ও সাবেক সিভিল সার্জন ডাক্তার মোঃ শামস উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক আলতাফ হোসাইন, জোনাইল ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান রাশেদুল ইসলাম রাসেল, জোনাইল বাজার ব্যবসায়ী সমিতির নবনির্বাচিত সভাপতি মসলেম উদ্দিন, বড়াইগ্রাম উপজেলা সমিতির উপদেষ্টা আব্দুল কাদের, পিকেএসএফের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মনির হোসেন, সমিতির সিনিয়র সহসভাপতি ও ঢাকা ইমপালস হাসপাতালের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার রাশিদুল ইসলাম, বড়াইগ্রাম সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক শফীউল হাসান তিতু, সমিতির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাফিসহ বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা।
নতুন ঘরের চাবি হাতে পেয়ে কফিল ও আসমতের চোখেমুখে ছিল স্বস্তির ছাপ। রাস্তার পাশে পলিথিনের নিচে দিন কাটানোর সেই কষ্টের অধ্যায় এখন তাঁদের কাছে অতীত। নতুন ঘরটি হয়তো তাঁদের জীবনের সব সংকট দূর করবে না, তবে অন্তত বৃষ্টি এলে আর ছাউনি উড়ে যাওয়ার ভয় থাকবে না। রাত নামলে থাকবে নিরাপদ আশ্রয়।

বিশেষ প্রতিনিধি (মোঃ তোজাম্মেল হক) 













