ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬, ৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
'জলের ছন্দে, হাওয়ার গন্ধে হারিয়ে যাই আজ অপার আনন্দে'

ঢাকাস্থ বড়াইগ্রাম উপজেলা সমিতির জমজমাট নৌকা ভ্রমণ

blank

জলের ছন্দে, হাওয়ার গন্ধে হারিয়ে যাই আজ অপার আনন্দে—এই শ্লোগানকে হৃদয়ে ধারণ করে ব্যস্ত রাজধানীর কোলাহল, ক্লান্তি আর নাগরিক জীবনের একঘেয়েমি পেছনে ফেলে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে ভাসল ঢাকাস্থ বড়াইগ্রাম উপজেলা সমিতির নৌকা ভ্রমণ।

শুক্রবার ভোর থেকেই যেন অন্যরকম এক উৎসবের আমেজ। কারও হাতে ব্যাগ, কারও হাতে খাবারের প্যাকেট, কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে, কেউবা প্রিয়জন ও পরিচিতজনদের সঙ্গে—সবাই ছুটে চলেছেন মিরপুরের দিয়াবাড়ী ঘাটের দিকে। উদ্দেশ্য একটাই—একটি দিন শহরের যান্ত্রিক জীবন থেকে দূরে, প্রকৃতির কাছে, আপনজনদের সান্নিধ্যে, আনন্দ আর স্মৃতির রঙে রাঙিয়ে তোলা।

সকাল সাড়ে ৭টা। দিয়াবাড়ী ঘাট থেকে ধীরে ধীরে ছেড়ে দিল বিশাল নৌকাটি। নৌকার ছাদজুড়ে বিস্তৃত খোলা আকাশ। চারদিকে নদীর জল আর বাতাসের মৃদু শিহরণ। তুরাগের বুক চিরে নৌকা যতই এগিয়ে চলল, ততই পেছনে পড়ে রইল নগরজীবনের ব্যস্ততা। মনে হলো, আজকের দিনটি শুধু ভ্রমণের নয়—আজ যেন ফিরে পাওয়ার দিন, হারিয়ে যাওয়া কিছু নির্মল আনন্দকে আবার ছুঁয়ে দেখার দিন।

blank

কিছুক্ষণ পর নৌকা থামল বসিলা সেতুর কাছে। সেখান থেকে আরও কয়েকজন যাত্রী নৌকায় উঠলেন। সব মিলিয়ে প্রায় ৫০-৬০ জনের প্রাণবন্ত একটি দল। নৌকা আবার চলতে শুরু করল আপন গতিতে।

সকাল ৯টার দিকে পরিবেশন করা হলো সকালের নাস্তা। মাংস দিয়ে ভূনা খিচুড়ির সুবাসে মুহূর্তেই মুখর হয়ে উঠল নৌকার চারপাশ। কেউ ছাদে বসে, কেউ নৌকার ভেতরে—আনন্দ-আড্ডার মধ্যেই সবাই পরম তৃপ্তিতে সেরে নিলেন সকালের আহার।

এরপর এলো আরও একটি আনন্দঘন মুহূর্ত। বড়াইগ্রাম উপজেলা সমিতির লোগো সম্বলিত টি-শার্ট বিতরণ করা হলো সকলের মাঝে। একই পোশাকে, একই আবেগে, একই বন্ধনের প্রতীক হয়ে সবাই দাঁড়ালেন একসঙ্গে। শুরু হলো ছবি তোলা। ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি হতে থাকল হাসিমুখ, উচ্ছ্বাস আর বন্ধুত্বের অসংখ্য মুহূর্ত।

blank

নৌকার সাউন্ড সিস্টেমে তখন বেজে চলেছে নানা ধরনের গান। কেউ গানের তালে হাততালি দিচ্ছেন, কেউ নেচে উঠছেন, কেউবা বন্ধুদের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টায় মেতে উঠেছেন। বয়স যেন সেখানে কোনো বাধা নয়। নাগরিক জীবনের বয়স, পেশা, ব্যস্ততা—সবকিছু ভুলে সবাই যেন ফিরে গিয়েছিলেন কৈশোরের সেই দুরন্ত দিনগুলোতে।

এরপর অনুষ্ঠিত হলো পরিচয় পর্ব। কে কোথায় থাকেন, কে কোন পেশায় আছেন, কার পরিবারে কে কে আছেন—নতুন করে একে অন্যকে জানার সুযোগ হলো সবার। পরিচয়পর্ব শেষে স্পষ্ট হলো, এই নৌকায় শুধু মানুষ নয়, একসঙ্গে ভেসে চলেছে বড়াইগ্রামের মাটি, শেকড়, স্মৃতি ও আত্মীয়তার এক অদৃশ্য বন্ধন।

নৌকা তখন এগিয়ে চলেছে বুড়িগঙ্গার বুক চিরে। একে একে পেছনে পড়ে যাচ্ছে নানা জনপদ, ঘাট আর পরিচিত-অপরিচিত দৃশ্য। নগরের ইট-কাঠের দেয়াল ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে দৃষ্টিসীমা থেকে। তার জায়গা দখল করে নিচ্ছে গ্রামবাংলার চিরচেনা রূপ—নদীর পাড়, সবুজের রেখা, ছোট ছোট ঘরবাড়ি আর মুক্ত আকাশ।

 

নৌকা এগিয়ে চলেছে মুন্সিগঞ্জের দিকে। সময় গড়াচ্ছে, কিন্তু আনন্দের কোনো কমতি নেই। বরং যত সময় যাচ্ছে, ততই বাড়ছে প্রত্যাশা—কখন দেখা মিলবে পদ্মার, কখন চোখে পড়বে সেই স্বপ্নের পদ্মা সেতু!

অবশেষে প্রায় পাঁচ ঘণ্টার একটানা নৌযাত্রার পর দূর দিগন্তে দেখা দিল পদ্মা সেতুর আবছা অবয়ব।

মুহূর্তেই নৌকার ছাদে যেন আনন্দের বিস্ফোরণ!

দূর থেকে সেতুর ঝাপসা অবয়ব দেখেই কেউ চিৎকার করে উঠলেন, কেউ মোবাইল ফোন বের করে ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। নৌকা যত এগিয়ে যাচ্ছিল, পদ্মা সেতুও তত স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। বিশাল সেই স্থাপনা যেন পদ্মার বুকের ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের অদম্য সক্ষমতার এক গর্বিত প্রতীক হয়ে সামনে হাজির হলো।

এরই মধ্যে এলো জুমার নামাজের সময়। নদীর তীর ঘেঁষা একটি মসজিদের পাশে নৌকা থামানো হলো। সবাই নেমে জুমার নামাজ আদায় করলেন। নামাজ শেষে আবার শুরু হলো আনন্দের আরেক অধ্যায়।

নৌকাতেই তখন চলছিল রান্নাবান্না। রান্না শেষ। খাবারের আগে পোশাক বদলে অনেকেই হইহই করে নেমে পড়লেন পদ্মার বুকে। বিশাল পদ্মার জলে অবগাহন, সাঁতার আর জলকেলিতে মুহূর্তেই তৈরি হলো এক অন্যরকম আনন্দের আবহ।

blank

চারদিকে পদ্মার বিস্তীর্ণ জলরাশি। সেই জল কেটে ছুটে চলছে ছোট-বড় নৌকা, ট্রলার ও নানা ধরনের জাহাজ। কখনো নৌ পুলিশের টহল স্পিডবোট দ্রুতগতিতে ছুটে যাচ্ছে। পদ্মার জলে সেই সময়টি যেন সবার কাছে হয়ে উঠেছিল জীবনের এক দুর্লভ অভিজ্ঞতা।

গোসল শেষে সবাই ফিরে এলেন নৌকায়। এরপর শুরু হলো মধ্যাহ্নভোজ।

চিকন চালের ভাত, ইলিশ, মুরগি, ডাল আর সালাদ—বাঙালির রসনাকে তৃপ্ত করার মতো আয়োজন। পর্যাপ্ত খাবার, সঙ্গে নদীর বুকে চলন্ত নৌকা আর চারপাশে প্রিয় মানুষের উপস্থিতি—সব মিলিয়ে জমে উঠল এক পরম তৃপ্তির ভোজ। কেউ বললেন, এমন খাবারের স্বাদ স্থলভাগের কোনো রেস্টুরেন্টে পাওয়া সম্ভব নয়। কারণ খাবারের সঙ্গে এখানে মিশে আছে নদীর বাতাস, ভ্রমণের আনন্দ আর আপনজনের ভালোবাসা।

খাওয়া-দাওয়া শেষে নৌকা এগিয়ে গেল পদ্মা সেতুর আরও কাছে।

blank

এবার যেন চোখের সামনে এক মহাবিস্ময়!

খুব কাছ থেকে দেখা গেল পদ্মা সেতু। পদ্মার এপার-ওপারকে যেন এক সুতোয় বেঁধে দিয়েছে কংক্রিটের এই বিশাল কাঠামো। সেতুর ওপর দিয়ে ছুটে চলেছে ট্রেন, বাস ও নানা ধরনের যানবাহন। আর নিচে নদীর বুক দিয়ে ধীরগতিতে এগিয়ে চলছে নৌকা।

সবাই উঠে এলেন নৌকার ছাদে। শুরু হলো ছবি তোলার উৎসব। কেউ একা, কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে—পদ্মা সেতুকে পেছনে রেখে ক্যামেরাবন্দি হলো অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত।

তবে সারাদিনের রোদ ও আনন্দ-উচ্ছ্বাসে একসময় অনেকেই ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। কেউ নৌকার নিচের অংশে গিয়ে বিশ্রাম নিলেন। বিকেলের দিকে সূর্যের তেজ কিছুটা কমতেই আবার সবাই ছাদে ফিরে এলেন।

এরপর শুরু হলো ফেরার প্রস্তুতি। কিন্তু আনন্দের শেষ তখনও হয়নি।

বাকি ছিল র‍্যাফেল ড্র।

রীতিমতো হকারের মতো হাঁকডাক দিয়ে শুরু হলো ‘পুশিং সেল’। কেউ কিনলেন এক হাজার টাকার টিকিট, কেউ দুই হাজার, কেউবা পাঁচশ টাকার। পুরস্কারের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩০টি। সঙ্গে ছিল বেশ কিছু সান্ত্বনা পুরস্কার। ফলে শেষ পর্যন্ত কাউকেই হতাশ হতে হয়নি। কমবেশি প্রায় সবাই কিছু না কিছু পুরস্কার নিয়ে ফিরলেন। তবে সবাইকে অবাক করে দিয়ে ১ম পুরস্কার জিতলেন সমিতির সিনিঃ সহ সভাপতি সিরাজুল ইসলাম নান্নু।

blank

এরপর শুরু হলো সাধারণ জ্ঞানের কুইজ। প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যারা বিজয়ী হলেন, তাদের জন্য ছিল লাক্স সাবানসহ নানা উপহার। কুইজ পর্বেও অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে দেখা গেল তুমুল উৎসাহ ও প্রতিযোগিতার আমেজ।

দিনের আলো তখন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। নৌকা ফিরতি পথ ধরেছে। সন্ধ্যার পর আবারও প্রবেশ করল সেই বুড়িগঙ্গায়।

তবে দিনের বুড়িগঙ্গা আর রাতের বুড়িগঙ্গা যেন দুই ভিন্ন পৃথিবী।

রাতের অন্ধকারে নদীর বুকে জ্বলে উঠেছে ছোট-বড় লঞ্চ, স্টিমার ও জাহাজের আলো। দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে সদরঘাট ছেড়ে যাচ্ছে যাত্রীবোঝাই নৌযান। নদীর বুকে আলো-আঁধারির সেই দৃশ্য যেন এক চলমান জলচিত্র।

আবারও বসিলা ব্রিজের কাছে থামল নৌকা। কয়েকজন যাত্রী নেমে গেলেন। এরপর শেষ গন্তব্য—সেই দিয়াবাড়ী ঘাট।

সকাল সাড়ে ৭টায় যে ঘাট থেকে যাত্রা শুরু হয়েছিল, প্রায় ১৪ ঘণ্টা পর রাত সাড়ে ৯টার দিকে আবার সেখানেই ফিরল নৌকা।

ততক্ষণে সবাই ক্লান্ত, শ্রান্ত, অবসন্ন। কিন্তু সেই ক্লান্তির মধ্যেও মুখে ছিল তৃপ্তির হাসি। ঘাটে নামার পর একে অন্যকে বিদায় জানিয়ে সবাই ছুটলেন নিজ নিজ গন্তব্যে।

নৌকা থেমে গেল। মানুষগুলো চলে গেলেন। কিন্তু নদীর বুকজুড়ে, বাতাসের ভাঁজে আর সবার স্মৃতির মণিকোঠায় থেকে গেল একটি দিন—একটি আনন্দময় দিন, একটি আপন হয়ে ওঠার দিন।

blank

একটি দিনের ভ্রমণ, অনেক দিনের স্মৃতি

আসলে নৌকা ভ্রমণটি ছিল শুধু নদী দেখা কিংবা পদ্মা সেতু দর্শনের আয়োজন নয়। এর গভীরে ছিল শেকড়ের টান, পারস্পরিক সৌহার্দ্য, বন্ধুত্ব ও আত্মীয়তার বন্ধনকে আরও দৃঢ় করার প্রয়াস। ঢাকার ব্যস্ত জীবনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বড়াইগ্রামের মানুষগুলোকে এক ছাদের নিচে, এক নৌকার ছায়ায়, এক আনন্দের স্রোতে একত্রিত করার এই আয়োজন যেন বড়াইগ্রামের মানুষের মিলনমেলারই এক জলজ সংস্করণ।

এই আয়োজন সফল করতে যারা সময়, শ্রম, অর্থ ও মেধা দিয়ে নিরলসভাবে সহযোগিতা করেছেন, তাদের মধ্যে ছিলেন সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি  নৌকা ভ্রমণ উপকমিটির আহবায়ক সাহেন আলী মিঠু, সিনিয়র সহসভাপতি সিরাজুল ইসলাম নান্নু, সহসভাপতি ইঞ্জিঃ সুজন আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হক খোকন, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দুলাল উদ্দিন ভূঁইয়া, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম ফিরোজ,  যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক সোহান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান রিপন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গাজী জালাল, অর্থ সম্পাদক ও নৌকা ভ্রমণ উপকমিটির সদস্যসচিব বেলাল হোসেন,  সাংগঠনিক সম্পাদক রিমন মোল্লা, সহ সাংগঠনিক সম্পাদক ইঞ্জিঃ লিটন হোসেন, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ইঞ্জিঃ আল হেলাল,  দপ্তর  সম্পাদক শফিকুল ইসলাম  বাবু, আইনবিষয়ক সম্পাদক মাহফুজুর রহমান, সমাজকল্যাণ সম্পাদক মহিবুর রহমান সজল, শিক্ষা ও সাহিত্য সম্পাদক জিল্লুর রহমান  প্রমুখ।

নৌকা ভ্রমণে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বড়াইগ্রাম উপজেলা সমিতির উপদেষ্টা মার্শাল ডি কস্তা, নৌবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা আবু মুসা মো. সালেক, ঢাকা সিটি কলেজের অধ্যাপক আব্দুল আজিজ, জোনাইল ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক লুৎফর রহমান প্রমুখ।

blank

দিন শেষে হয়তো প্রত্যেকে ফিরে গেছেন নিজ নিজ ঠিকানায়। কিন্তু ফিরে যায়নি নদীর ঢেউ, পদ্মার জল, সেতুর বিস্ময়, নৌকার গান, হাসি-আড্ডা আর প্রিয় মানুষগুলোর মুখ।

সেগুলো থেকে গেছে স্মৃতির মণিকোঠায়।

হয়তো কোনো এক ব্যস্ত বিকেলে, রাজধানীর কোলাহলের মধ্যে হঠাৎ মনে পড়বে সেই দিনটির কথা—

জলের ছন্দে, হাওয়ার গন্ধে, আপনজনের ভালোবাসায় হারিয়ে যাওয়ার সেই অপার আনন্দের কথা।

আর তখন মনে হবে—

একটি নৌকা ভ্রমণ শেষ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার গল্পটি শেষ হয়নি; সেটি বেঁচে থাকবে বহুদিন, বহু মানুষের স্মৃতির পাতায়।

জনপ্রিয় খবর
blank

সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্ক যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

'জলের ছন্দে, হাওয়ার গন্ধে হারিয়ে যাই আজ অপার আনন্দে'

ঢাকাস্থ বড়াইগ্রাম উপজেলা সমিতির জমজমাট নৌকা ভ্রমণ

প্রকাশের সময় : ০৭:৫৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬
blank

জলের ছন্দে, হাওয়ার গন্ধে হারিয়ে যাই আজ অপার আনন্দে—এই শ্লোগানকে হৃদয়ে ধারণ করে ব্যস্ত রাজধানীর কোলাহল, ক্লান্তি আর নাগরিক জীবনের একঘেয়েমি পেছনে ফেলে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে ভাসল ঢাকাস্থ বড়াইগ্রাম উপজেলা সমিতির নৌকা ভ্রমণ।

শুক্রবার ভোর থেকেই যেন অন্যরকম এক উৎসবের আমেজ। কারও হাতে ব্যাগ, কারও হাতে খাবারের প্যাকেট, কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে, কেউবা প্রিয়জন ও পরিচিতজনদের সঙ্গে—সবাই ছুটে চলেছেন মিরপুরের দিয়াবাড়ী ঘাটের দিকে। উদ্দেশ্য একটাই—একটি দিন শহরের যান্ত্রিক জীবন থেকে দূরে, প্রকৃতির কাছে, আপনজনদের সান্নিধ্যে, আনন্দ আর স্মৃতির রঙে রাঙিয়ে তোলা।

সকাল সাড়ে ৭টা। দিয়াবাড়ী ঘাট থেকে ধীরে ধীরে ছেড়ে দিল বিশাল নৌকাটি। নৌকার ছাদজুড়ে বিস্তৃত খোলা আকাশ। চারদিকে নদীর জল আর বাতাসের মৃদু শিহরণ। তুরাগের বুক চিরে নৌকা যতই এগিয়ে চলল, ততই পেছনে পড়ে রইল নগরজীবনের ব্যস্ততা। মনে হলো, আজকের দিনটি শুধু ভ্রমণের নয়—আজ যেন ফিরে পাওয়ার দিন, হারিয়ে যাওয়া কিছু নির্মল আনন্দকে আবার ছুঁয়ে দেখার দিন।

blank

কিছুক্ষণ পর নৌকা থামল বসিলা সেতুর কাছে। সেখান থেকে আরও কয়েকজন যাত্রী নৌকায় উঠলেন। সব মিলিয়ে প্রায় ৫০-৬০ জনের প্রাণবন্ত একটি দল। নৌকা আবার চলতে শুরু করল আপন গতিতে।

সকাল ৯টার দিকে পরিবেশন করা হলো সকালের নাস্তা। মাংস দিয়ে ভূনা খিচুড়ির সুবাসে মুহূর্তেই মুখর হয়ে উঠল নৌকার চারপাশ। কেউ ছাদে বসে, কেউ নৌকার ভেতরে—আনন্দ-আড্ডার মধ্যেই সবাই পরম তৃপ্তিতে সেরে নিলেন সকালের আহার।

এরপর এলো আরও একটি আনন্দঘন মুহূর্ত। বড়াইগ্রাম উপজেলা সমিতির লোগো সম্বলিত টি-শার্ট বিতরণ করা হলো সকলের মাঝে। একই পোশাকে, একই আবেগে, একই বন্ধনের প্রতীক হয়ে সবাই দাঁড়ালেন একসঙ্গে। শুরু হলো ছবি তোলা। ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি হতে থাকল হাসিমুখ, উচ্ছ্বাস আর বন্ধুত্বের অসংখ্য মুহূর্ত।

blank

নৌকার সাউন্ড সিস্টেমে তখন বেজে চলেছে নানা ধরনের গান। কেউ গানের তালে হাততালি দিচ্ছেন, কেউ নেচে উঠছেন, কেউবা বন্ধুদের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টায় মেতে উঠেছেন। বয়স যেন সেখানে কোনো বাধা নয়। নাগরিক জীবনের বয়স, পেশা, ব্যস্ততা—সবকিছু ভুলে সবাই যেন ফিরে গিয়েছিলেন কৈশোরের সেই দুরন্ত দিনগুলোতে।

এরপর অনুষ্ঠিত হলো পরিচয় পর্ব। কে কোথায় থাকেন, কে কোন পেশায় আছেন, কার পরিবারে কে কে আছেন—নতুন করে একে অন্যকে জানার সুযোগ হলো সবার। পরিচয়পর্ব শেষে স্পষ্ট হলো, এই নৌকায় শুধু মানুষ নয়, একসঙ্গে ভেসে চলেছে বড়াইগ্রামের মাটি, শেকড়, স্মৃতি ও আত্মীয়তার এক অদৃশ্য বন্ধন।

নৌকা তখন এগিয়ে চলেছে বুড়িগঙ্গার বুক চিরে। একে একে পেছনে পড়ে যাচ্ছে নানা জনপদ, ঘাট আর পরিচিত-অপরিচিত দৃশ্য। নগরের ইট-কাঠের দেয়াল ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে দৃষ্টিসীমা থেকে। তার জায়গা দখল করে নিচ্ছে গ্রামবাংলার চিরচেনা রূপ—নদীর পাড়, সবুজের রেখা, ছোট ছোট ঘরবাড়ি আর মুক্ত আকাশ।

 

নৌকা এগিয়ে চলেছে মুন্সিগঞ্জের দিকে। সময় গড়াচ্ছে, কিন্তু আনন্দের কোনো কমতি নেই। বরং যত সময় যাচ্ছে, ততই বাড়ছে প্রত্যাশা—কখন দেখা মিলবে পদ্মার, কখন চোখে পড়বে সেই স্বপ্নের পদ্মা সেতু!

অবশেষে প্রায় পাঁচ ঘণ্টার একটানা নৌযাত্রার পর দূর দিগন্তে দেখা দিল পদ্মা সেতুর আবছা অবয়ব।

মুহূর্তেই নৌকার ছাদে যেন আনন্দের বিস্ফোরণ!

দূর থেকে সেতুর ঝাপসা অবয়ব দেখেই কেউ চিৎকার করে উঠলেন, কেউ মোবাইল ফোন বের করে ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। নৌকা যত এগিয়ে যাচ্ছিল, পদ্মা সেতুও তত স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। বিশাল সেই স্থাপনা যেন পদ্মার বুকের ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের অদম্য সক্ষমতার এক গর্বিত প্রতীক হয়ে সামনে হাজির হলো।

এরই মধ্যে এলো জুমার নামাজের সময়। নদীর তীর ঘেঁষা একটি মসজিদের পাশে নৌকা থামানো হলো। সবাই নেমে জুমার নামাজ আদায় করলেন। নামাজ শেষে আবার শুরু হলো আনন্দের আরেক অধ্যায়।

নৌকাতেই তখন চলছিল রান্নাবান্না। রান্না শেষ। খাবারের আগে পোশাক বদলে অনেকেই হইহই করে নেমে পড়লেন পদ্মার বুকে। বিশাল পদ্মার জলে অবগাহন, সাঁতার আর জলকেলিতে মুহূর্তেই তৈরি হলো এক অন্যরকম আনন্দের আবহ।

blank

চারদিকে পদ্মার বিস্তীর্ণ জলরাশি। সেই জল কেটে ছুটে চলছে ছোট-বড় নৌকা, ট্রলার ও নানা ধরনের জাহাজ। কখনো নৌ পুলিশের টহল স্পিডবোট দ্রুতগতিতে ছুটে যাচ্ছে। পদ্মার জলে সেই সময়টি যেন সবার কাছে হয়ে উঠেছিল জীবনের এক দুর্লভ অভিজ্ঞতা।

গোসল শেষে সবাই ফিরে এলেন নৌকায়। এরপর শুরু হলো মধ্যাহ্নভোজ।

চিকন চালের ভাত, ইলিশ, মুরগি, ডাল আর সালাদ—বাঙালির রসনাকে তৃপ্ত করার মতো আয়োজন। পর্যাপ্ত খাবার, সঙ্গে নদীর বুকে চলন্ত নৌকা আর চারপাশে প্রিয় মানুষের উপস্থিতি—সব মিলিয়ে জমে উঠল এক পরম তৃপ্তির ভোজ। কেউ বললেন, এমন খাবারের স্বাদ স্থলভাগের কোনো রেস্টুরেন্টে পাওয়া সম্ভব নয়। কারণ খাবারের সঙ্গে এখানে মিশে আছে নদীর বাতাস, ভ্রমণের আনন্দ আর আপনজনের ভালোবাসা।

খাওয়া-দাওয়া শেষে নৌকা এগিয়ে গেল পদ্মা সেতুর আরও কাছে।

blank

এবার যেন চোখের সামনে এক মহাবিস্ময়!

খুব কাছ থেকে দেখা গেল পদ্মা সেতু। পদ্মার এপার-ওপারকে যেন এক সুতোয় বেঁধে দিয়েছে কংক্রিটের এই বিশাল কাঠামো। সেতুর ওপর দিয়ে ছুটে চলেছে ট্রেন, বাস ও নানা ধরনের যানবাহন। আর নিচে নদীর বুক দিয়ে ধীরগতিতে এগিয়ে চলছে নৌকা।

সবাই উঠে এলেন নৌকার ছাদে। শুরু হলো ছবি তোলার উৎসব। কেউ একা, কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে—পদ্মা সেতুকে পেছনে রেখে ক্যামেরাবন্দি হলো অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত।

তবে সারাদিনের রোদ ও আনন্দ-উচ্ছ্বাসে একসময় অনেকেই ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। কেউ নৌকার নিচের অংশে গিয়ে বিশ্রাম নিলেন। বিকেলের দিকে সূর্যের তেজ কিছুটা কমতেই আবার সবাই ছাদে ফিরে এলেন।

এরপর শুরু হলো ফেরার প্রস্তুতি। কিন্তু আনন্দের শেষ তখনও হয়নি।

বাকি ছিল র‍্যাফেল ড্র।

রীতিমতো হকারের মতো হাঁকডাক দিয়ে শুরু হলো ‘পুশিং সেল’। কেউ কিনলেন এক হাজার টাকার টিকিট, কেউ দুই হাজার, কেউবা পাঁচশ টাকার। পুরস্কারের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩০টি। সঙ্গে ছিল বেশ কিছু সান্ত্বনা পুরস্কার। ফলে শেষ পর্যন্ত কাউকেই হতাশ হতে হয়নি। কমবেশি প্রায় সবাই কিছু না কিছু পুরস্কার নিয়ে ফিরলেন। তবে সবাইকে অবাক করে দিয়ে ১ম পুরস্কার জিতলেন সমিতির সিনিঃ সহ সভাপতি সিরাজুল ইসলাম নান্নু।

blank

এরপর শুরু হলো সাধারণ জ্ঞানের কুইজ। প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যারা বিজয়ী হলেন, তাদের জন্য ছিল লাক্স সাবানসহ নানা উপহার। কুইজ পর্বেও অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে দেখা গেল তুমুল উৎসাহ ও প্রতিযোগিতার আমেজ।

দিনের আলো তখন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। নৌকা ফিরতি পথ ধরেছে। সন্ধ্যার পর আবারও প্রবেশ করল সেই বুড়িগঙ্গায়।

তবে দিনের বুড়িগঙ্গা আর রাতের বুড়িগঙ্গা যেন দুই ভিন্ন পৃথিবী।

রাতের অন্ধকারে নদীর বুকে জ্বলে উঠেছে ছোট-বড় লঞ্চ, স্টিমার ও জাহাজের আলো। দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে সদরঘাট ছেড়ে যাচ্ছে যাত্রীবোঝাই নৌযান। নদীর বুকে আলো-আঁধারির সেই দৃশ্য যেন এক চলমান জলচিত্র।

আবারও বসিলা ব্রিজের কাছে থামল নৌকা। কয়েকজন যাত্রী নেমে গেলেন। এরপর শেষ গন্তব্য—সেই দিয়াবাড়ী ঘাট।

সকাল সাড়ে ৭টায় যে ঘাট থেকে যাত্রা শুরু হয়েছিল, প্রায় ১৪ ঘণ্টা পর রাত সাড়ে ৯টার দিকে আবার সেখানেই ফিরল নৌকা।

ততক্ষণে সবাই ক্লান্ত, শ্রান্ত, অবসন্ন। কিন্তু সেই ক্লান্তির মধ্যেও মুখে ছিল তৃপ্তির হাসি। ঘাটে নামার পর একে অন্যকে বিদায় জানিয়ে সবাই ছুটলেন নিজ নিজ গন্তব্যে।

নৌকা থেমে গেল। মানুষগুলো চলে গেলেন। কিন্তু নদীর বুকজুড়ে, বাতাসের ভাঁজে আর সবার স্মৃতির মণিকোঠায় থেকে গেল একটি দিন—একটি আনন্দময় দিন, একটি আপন হয়ে ওঠার দিন।

blank

একটি দিনের ভ্রমণ, অনেক দিনের স্মৃতি

আসলে নৌকা ভ্রমণটি ছিল শুধু নদী দেখা কিংবা পদ্মা সেতু দর্শনের আয়োজন নয়। এর গভীরে ছিল শেকড়ের টান, পারস্পরিক সৌহার্দ্য, বন্ধুত্ব ও আত্মীয়তার বন্ধনকে আরও দৃঢ় করার প্রয়াস। ঢাকার ব্যস্ত জীবনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বড়াইগ্রামের মানুষগুলোকে এক ছাদের নিচে, এক নৌকার ছায়ায়, এক আনন্দের স্রোতে একত্রিত করার এই আয়োজন যেন বড়াইগ্রামের মানুষের মিলনমেলারই এক জলজ সংস্করণ।

এই আয়োজন সফল করতে যারা সময়, শ্রম, অর্থ ও মেধা দিয়ে নিরলসভাবে সহযোগিতা করেছেন, তাদের মধ্যে ছিলেন সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি  নৌকা ভ্রমণ উপকমিটির আহবায়ক সাহেন আলী মিঠু, সিনিয়র সহসভাপতি সিরাজুল ইসলাম নান্নু, সহসভাপতি ইঞ্জিঃ সুজন আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হক খোকন, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দুলাল উদ্দিন ভূঁইয়া, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম ফিরোজ,  যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক সোহান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান রিপন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গাজী জালাল, অর্থ সম্পাদক ও নৌকা ভ্রমণ উপকমিটির সদস্যসচিব বেলাল হোসেন,  সাংগঠনিক সম্পাদক রিমন মোল্লা, সহ সাংগঠনিক সম্পাদক ইঞ্জিঃ লিটন হোসেন, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ইঞ্জিঃ আল হেলাল,  দপ্তর  সম্পাদক শফিকুল ইসলাম  বাবু, আইনবিষয়ক সম্পাদক মাহফুজুর রহমান, সমাজকল্যাণ সম্পাদক মহিবুর রহমান সজল, শিক্ষা ও সাহিত্য সম্পাদক জিল্লুর রহমান  প্রমুখ।

নৌকা ভ্রমণে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বড়াইগ্রাম উপজেলা সমিতির উপদেষ্টা মার্শাল ডি কস্তা, নৌবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা আবু মুসা মো. সালেক, ঢাকা সিটি কলেজের অধ্যাপক আব্দুল আজিজ, জোনাইল ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক লুৎফর রহমান প্রমুখ।

blank

দিন শেষে হয়তো প্রত্যেকে ফিরে গেছেন নিজ নিজ ঠিকানায়। কিন্তু ফিরে যায়নি নদীর ঢেউ, পদ্মার জল, সেতুর বিস্ময়, নৌকার গান, হাসি-আড্ডা আর প্রিয় মানুষগুলোর মুখ।

সেগুলো থেকে গেছে স্মৃতির মণিকোঠায়।

হয়তো কোনো এক ব্যস্ত বিকেলে, রাজধানীর কোলাহলের মধ্যে হঠাৎ মনে পড়বে সেই দিনটির কথা—

জলের ছন্দে, হাওয়ার গন্ধে, আপনজনের ভালোবাসায় হারিয়ে যাওয়ার সেই অপার আনন্দের কথা।

আর তখন মনে হবে—

একটি নৌকা ভ্রমণ শেষ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার গল্পটি শেষ হয়নি; সেটি বেঁচে থাকবে বহুদিন, বহু মানুষের স্মৃতির পাতায়।