ব্রহ্মপুত্র নদ পেরিয়ে যেতে হয়। বর্ষায় যোগাযোগ আরও কঠিন। চারদিকে নদী আর বালুচর। এমন দুর্গম জনপদেই প্রায় ৯ হাজার মানুষের বসবাস। কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার নয়ারহাট ইউনিয়নের ফেইচকার চর।
চরের মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং কৃষি ও পশুপাখি পালনের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্য নিয়ে সেখানে দিনভর কর্মসূচি পালন করেছে জেলা প্রশাসন।
সোমবার (১৭ আগস্ট) দিনভর আয়োজিত সমাবেশে জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা চরবাসীর সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁদের সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা শোনেন।
জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথের নেতৃত্বে কর্মসূচিতে অংশ নেন জেলা পরিষদের প্রশাসক সোহেল হোসাইন কায়েকোবাদ, সিভিল সার্জন ডা. স্বপন কুমার বিশ্বাস, জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান, চিলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসানসহ জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা।
সমাবেশে চরবাসীর জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কৃষি ও পশুপাখি পালনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। কর্মকর্তারা বলেন, চরের মানুষের হাতে যে সম্পদ রয়েছে, তার সঠিক পরিচর্যা করা গেলে তা-ই তাঁদের পরিবারের আয় বাড়ানোর বড় মাধ্যম হতে পারে।
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কুড়িগ্রামে প্রায় সাড়ে ৯ লাখ গরু রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ গরু বিভিন্ন চরে পালন করা হয়। জেলায় সাড়ে ৭ লাখ ছাগলের মধ্যে চরে রয়েছে প্রায় আড়াই লাখ।
এছাড়া জেলায় প্রায় ১৬ হাজার মহিষ রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৫ হাজার মহিষ চরাঞ্চলে পালন করা হয়। হাঁস-মুরগির সংখ্যাও চরে কম নয়। জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের হিসাবে, বিপুলসংখ্যক হাঁস-মুরগি চরাঞ্চলের মানুষের পারিবারিক আয়ের সঙ্গে যুক্ত।
চরের মানুষের এই বিপুল পশুসম্পদকে আরও উৎপাদনশীল করার ওপর গুরুত্ব দেন কর্মকর্তারা। তাঁরা বলেন, শুধু পশু পালন করলেই হবে না, রোগ প্রতিরোধ, খাবার, বাসস্থান ও নিয়মিত পরিচর্যার বিষয়ে চরবাসীকে সচেতন হতে হবে।
সমাবেশে পশুপাখিকে রোগমুক্ত রাখতে সময়মতো ভ্যাকসিন দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। গবাদিপশুর পাশাপাশি হাঁস-মুরগির রোগ প্রতিরোধেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান চরবাসীকে পশুর অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত প্রাণিসম্পদ বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, নিয়মিত টিকা ও সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে পশুর মৃত্যুহার কমানোর পাশাপাশি উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।
চরবাসীর অনেকে জানান, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও হাঁস-মুরগি পালন করে আসছেন। কিন্তু পশুর রোগ হলে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া, টিকা দেওয়া এবং উন্নত পরিচর্যার বিষয়ে তাঁদের অনেকেরই পর্যাপ্ত ধারণা নেই। সরকারি সহায়তা ও পরামর্শ নিয়মিত পাওয়া গেলে পশুপালন আরও বাড়াতে চান তাঁরা।
ফেইচকার চরের মানুষের বড় সমস্যাগুলোর একটি শিক্ষা। নদীবিচ্ছিন্ন এই চর থেকে শিশুদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত কঠিন। ফলে অনেক শিশুই নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারে না।
সমাবেশে চরাঞ্চলের শিশুদের বিদ্যালয়মুখী করা এবং শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। চরবাসীদের উদ্দেশে বক্তারা বলেন, সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষার বিকল্প নেই। প্রতিকূলতা থাকলেও সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে হবে এবং কোনো শিশু যেন শিক্ষার বাইরে না থাকে, সে বিষয়ে সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে।
বাল্যবিবাহ বন্ধে সামাজিক প্রতিরোধ
চরের আরেকটি বড় সামাজিক সমস্যা বাল্যবিবাহ। দারিদ্র্য, নিরাপত্তাহীনতা, যোগাযোগব্যবস্থার সমস্যা ও সামাজিক চাপের কারণে অনেক পরিবার অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
সমাবেশে বাল্যবিবাহের কুফল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। বক্তারা আরও বলেন, অল্প বয়সে বিয়ে একটি মেয়ের শিক্ষা বন্ধ করে দেয় এবং তার স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ জীবনে নানা ঝুঁকি তৈরি করে। পরিবার, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া বাল্যবিবাহ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়।
চরবাসীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার বিষয়েও সমাবেশে আলোচনা হয়। নদীবেষ্টিত ও দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হয়।
সিভিল সার্জন ডা. স্বপন কুমার বিশ্বাস বলেন, চরাঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার অন্য এলাকার মানুষের মতোই। মা ও শিশুর স্বাস্থ্য, টিকাদান, পুষ্টি, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধসহ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে আরও সক্রিয় হতে হবে।
জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, চরবাসীকে শুধু সহায়তা দিয়ে নির্ভরশীল করে রাখা নয়, তাঁদের নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে হবে। তাঁদের হাতে থাকা জমি, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি ও অন্যান্য সম্পদকে কাজে লাগিয়ে আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করা জরুরি।
তিনি বলেন, “চরের মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁদের শ্রম ও তাঁদের সম্পদ। গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও হাঁস-মুরগির সঠিক পরিচর্যা করতে পারলে এগুলোই তাঁদের পরিবারের আয়ের বড় উৎস হতে পারে। সময়মতো ভ্যাকসিন, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো কাজ করবে।”
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, চরবাসীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং জীবিকার উন্নয়ন—সবকিছুকে একসঙ্গে দেখতে হবে। শুধু একটি সমস্যা সমাধান করে চরবাসীর জীবনমানের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, “চরের মানুষ যেন নিজেদের এলাকার সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে স্বাবলম্বী হতে পারেন, সে জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও সমন্বয় করা হবে।”
দিনভর এই কর্মসূচিকে ঘিরে ফেইচকার চরের মানুষের মধ্যে উৎসাহ দেখা যায়। তাঁদের প্রত্যাশা, এক দিনের সমাবেশে আলোচনা সীমাবদ্ধ না থেকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পশুপালন ও জীবিকার উন্নয়নে নিয়মিত সরকারি সেবা পৌঁছাবে দুর্গম এই চরাঞ্চলে।

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি 

















