মানুষের জীবনকে বছর দিয়ে নয়, কর্ম দিয়ে মূল্যায়ন করা হয়। কেউ দীর্ঘ জীবন পেয়েও ইতিহাসে স্থান করে নিতে পারেন না, আবার কেউ স্বল্পায়ু হয়েও মানুষের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকেন। এমনই এক আলোকিত মানুষ ছিলেন শিক্ষাবিদ রফিকুল ইসলাম—একজন আদর্শ শিক্ষক, দূরদর্শী শিক্ষানুরাগী এবং মানুষ গড়ার নিবেদিতপ্রাণ কারিগর।
আজ থেকে ৪৭ বছর আগে, ১৯৭৯ সালের জুলাই মাসে মাত্র ৪৪ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর অকালপ্রয়াণে শুধু একটি পরিবার নয়, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, একটি জনপদ এবং অসংখ্য শিক্ষার্থী হারিয়েছিল তাদের প্রিয় শিক্ষককে। কিন্তু তাঁর প্রজ্জ্বলিত জ্ঞানের প্রদীপ আজও নিভে যায়নি; তা ছড়িয়ে আছে তাঁর ছাত্রদের কর্মে, চরিত্রে ও সাফল্যে।
তিনি ছিলেন আমাদের বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। ইতিহাসে মাস্টার্স এবং এম.এড. ডিগ্রিধারী এই মানুষটি এমন এক সময়ে শিক্ষকতাকে বেছে নিয়েছিলেন, যখন ইতিহাসে উচ্চশিক্ষা অর্জনকারীদের জন্য সম্মানজনক সরকারি চাকরির সুযোগ ছিল অবারিত। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন, রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণ হয় শ্রেণিকক্ষে, আর সেই নির্মাণের প্রধান কারিগর একজন শিক্ষক।
শিক্ষকতা তাঁর কাছে ছিল না জীবিকা; ছিল ইবাদতের মতো এক মহৎ ব্রত।
ইংরেজি ভাষা, ইতিহাস, দর্শন ও বিশ্বসাহিত্যের ওপর ছিল তাঁর বিস্ময়কর দখল। নিয়মিত পড়তেন বার্ট্রান্ড রাসেলের History of Western Philosophy -এর মতো কালজয়ী গ্রন্থ। Readers’ Digest–এর নিয়মিত গ্রাহক ছিলেন তিনি। ষাটের দশকের এক স্কুলশিক্ষকের এমন বিশ্বমুখী জ্ঞানচর্চা আজও বিস্ময় জাগায়। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষক যদি নিজে শিখতে না থাকেন, তবে তিনি আর শিক্ষার্থীদের সামনে আলোর দিশারি হতে পারেন না।
তখন কোচিং-বাণিজ্যের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। কিন্তু তিনি নিজ উদ্যোগে বিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীদের আলাদা করে চিহ্নিত করতেন এবং সম্পূর্ণ আন্তরিকতায় তাঁদের জন্য অতিরিক্ত পাঠদানের ব্যবস্থা করতেন। সেই সৌভাগ্যবান শিক্ষার্থীদের একজন ছিলাম আমি। আমার জীবনের প্রতিটি অর্জনের পেছনে তাঁর প্রেরণা, শিক্ষা ও আশীর্বাদের ঋণ চিরদিন বহন করব।
তাঁর নেতৃত্বে আমাদের বিদ্যালয় এসএসসি পরীক্ষায় যে ফলাফল অর্জন করেছিল, তা ছিল আগের দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। কিন্তু পরীক্ষার ফলই তাঁর সাফল্যের একমাত্র পরিচয় নয়। তাঁর প্রকৃত সাফল্য ছিল মানুষ গড়ে তোলা। তিনি এমন ছাত্র তৈরি করতে চেয়েছিলেন, যারা শুধু ভালো ফল করবে না—ভালো মানুষও হবে।
নিজের পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের প্রতিও ছিল তাঁর অসীম দায়বদ্ধতা। নিজের বাড়িতে রেখে বহু আত্মীয়কে পড়াশোনার সুযোগ করে দিয়েছেন। তাঁদের অনেকেই পরবর্তীকালে সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তিনি জানতেন, শিক্ষার চেয়ে বড় উত্তরাধিকার আর কিছু নেই।
আমার জীবনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল দ্বিমাত্রিক। প্রথমে তিনি ছিলেন আমার শিক্ষক, পরে তিনি হন আমার শ্বশুর। তাঁর সবচেয়ে আদরের সন্তান ছিলেন আমার সহধর্মিণী। তাঁকে ঘিরে ছিল তাঁর অগণিত স্বপ্ন। কিন্তু নিয়তির নির্মম খেলায় সেই স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে যায়। গত বছর আমার স্ত্রীও অকালে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। আজ বাবা ও মেয়ে পাশাপাশি চিরনিদ্রায় শায়িত।
যখন তাঁদের কবরের পাশে দাঁড়াই, তখন মনে হয়—সময় মানুষকে কেড়ে নিতে পারে, কিন্তু ভালোবাসা, শিক্ষা ও আদর্শকে কখনো মুছে ফেলতে পারে না। একজন আমাকে শিখিয়েছেন কীভাবে মানুষ হতে হয়; অন্যজন শিখিয়েছেন কীভাবে ভালোবাসতে হয়। দুজনই আজ অনুপস্থিত, কিন্তু তাঁদের স্মৃতি প্রতিটি দিন আমাকে পথ দেখায়।
আজ যখন সমাজে মূল্যবোধের অবক্ষয় নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন, তখন রফিকুল ইসলামের মতো শিক্ষকদের জীবন নতুন করে স্মরণ করার প্রয়োজন আরও বেশি। কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ হয় শ্রেণিকক্ষে, আর সেই ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন নীরবে, নিরলসভাবে, প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকা কিছু মহান শিক্ষক।
তাঁদের কেউ হয়তো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদক পান না, সংবাদ শিরোনামও হন না। কিন্তু তাঁদের হাতে গড়া মানুষরাই একদিন সমাজ, রাষ্ট্র ও সভ্যতার নেতৃত্ব দেয়। একজন আদর্শ শিক্ষক কখনো মৃত্যুবরণ করেন না; তিনি বেঁচে থাকেন তাঁর ছাত্রদের বিবেক, কর্ম ও চরিত্রে।
এই মহান শিক্ষক এবং তাঁর প্রিয় কন্যার স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। মহান আল্লাহ তাআলার দরবারে আন্তরিক প্রার্থনা—তিনি যেন তাঁদের উভয়কে জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন। তাঁদের কবরকে নূরে পরিপূর্ণ করে দিন এবং তাঁদের আদর্শ অনুসরণ করার তাওফিক আমাদের সবাইকে দান করুন।
———————————————–
লেখক: সাবেক অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ
আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ,ঢাকা
(লেখকের ফেসবুক ওয়াল থেকে নেয়া)

সিরাজুল ইসলাম 



















