বুরকিনা ফাসোর প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ট্রাওরে সাহেল রাষ্ট্র জোট (AES)-এর সম্মেলনে দেওয়া এক বক্তব্যে পশ্চিমা দেশগুলোর তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে আফ্রিকার প্রাকৃতিক সম্পদ বিদেশি শক্তির স্বার্থে ব্যবহৃত হলেও এর সুফল থেকে বঞ্চিত হয়েছে স্থানীয় জনগণ। একই সঙ্গে তিনি সাহেল অঞ্চলের দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব, আত্মনির্ভরতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানান।
ভাষণের শুরুতেই ট্রাওরে বলেন, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচকে বুরকিনা ফাসো, মালি ও নাইজারকে বিশ্বের দরিদ্রতম দেশের তালিকায় রাখা হয়। তবে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, যদি এসব দেশ সত্যিই এত দরিদ্র হয়, তাহলে বিদেশি শক্তিগুলো কেন এখান থেকে নিজেদের প্রভাব ও উপস্থিতি সরিয়ে নিতে চায় না।
নাইজারের ইউরেনিয়াম সম্পদের প্রসঙ্গ তুলে তিনি দাবি করেন, কয়েক দশক ধরে বিদেশি শক্তি ওই সম্পদ ব্যবহার করে নিজেদের দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে, অথচ নাইজারের জনগণ এখনও বিদ্যুৎ ও মৌলিক সেবার ঘাটতিতে ভুগছে। একইভাবে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে খনিজ সম্পদ উত্তোলন হলেও সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোর অবকাঠামো ও জনসেবার উন্নয়ন হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ট্রাওরের ভাষায়, এই বাস্তবতাই সাহেল অঞ্চলের দেশগুলোকে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্তে পৌঁছে দিয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, এ সিদ্ধান্তের পর বিদেশি শক্তি ও তাদের সহযোগীরা বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি, বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা এবং অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে।
তিনি আরও বলেন, সাহেল অঞ্চলের জনগণ এখন অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছে এবং বাইরের প্রভাবের কাছে আর নতি স্বীকার করবে না। স্বাধীনতা ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় জনগণ ঐক্যবদ্ধ রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের প্রসঙ্গ টেনে ট্রাওরে বলেন, পশ্চিমা দেশগুলো প্রায়ই এসব মূল্যবোধের কথা বললেও বাস্তবে এগুলোকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে। তার মতে, প্রতিটি দেশের নিজস্ব বাস্তবতা অনুযায়ী উন্নয়নের পথ নির্ধারণের অধিকার রয়েছে।
তিনি ২০২৩ সালের ২৬ জুলাই নাইজারের রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঘটনাও উল্লেখ করেন। ওই সময় নাইজারের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করে বুরকিনা ফাসো ও মালি যে অবস্থান নিয়েছিল, তা পুনর্ব্যক্ত করে ট্রাওরে বলেন, সাহেল অঞ্চলের কোনো সদস্য দেশের ওপর হামলা হলে তারা সম্মিলিতভাবে তার মোকাবিলা করবে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাওরে বলেন, ২০২৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর গঠিত সাহেল রাষ্ট্র জোট (AES) শুধু একটি প্রতিরক্ষা জোট নয়; ভবিষ্যতে এটিকে অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও উন্নয়নের অন্যান্য খাতেও কার্যকর সহযোগিতার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
ভাষণের শেষদিকে তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া কামনা করে বলেন, জনগণের সর্বোচ্চ স্বার্থ রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে এবং দেশের নিরাপত্তায় নিয়োজিত যোদ্ধাদের জন্যও তিনি প্রার্থনা করেন।
সমাপনী বক্তব্যে তিনি নাইজারের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে সাহেল রাষ্ট্র জোটের উদ্দেশে স্লোগান দেন— “মাতৃভূমি অথবা মৃত্যু।”

সাহেল রাষ্ট্র জোট (AES) কী?
Alliance of Sahel States (AES) বা সাহেল রাষ্ট্র জোট ২০২৩ সালে গঠিত একটি আঞ্চলিক জোট। এর সদস্য তিনটি দেশ হলো বুরকিনা ফাসো, মালি ও নাইজার। জোটটির ঘোষিত লক্ষ্য হচ্ছে পারস্পরিক সামরিক সহযোগিতা, যৌথ প্রতিরক্ষা, অর্থনৈতিক সমন্বয় এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা শক্তিশালী করা।

নূর মোহাম্মদ মুন 


















