বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক গত কয়েক দশকে ধারাবাহিকভাবে শক্তিশালী ও বহুমাত্রিক রূপ নিয়েছে। বর্তমানে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক শুধু গতানুগতিক বাণিজ্য বা কূটনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি, প্রযুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রতিরক্ষা এবং বিনিয়োগসহ বহুবিধ ক্ষেত্রে তা বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায়, যেখানে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব রাষ্ট্রসমূহের অগ্রগতির অন্যতম চালিকাশক্তি, সেখানে চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য উল্লেখযোগ্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করছে। তবে একই সঙ্গে পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় একটি দূরদর্শী ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখাও বাংলাদেশের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ।
চীন বর্তমান বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি এবং উৎপাদনশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃত। বাংলাদেশে সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পাঞ্চল এবং গভীর সমুদ্রবন্দরের মতো মেগা অবকাঠামো নির্মাণে চীনা বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এসব প্রকল্প দেশের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করার পাশাপাশি শিল্পায়নকে ত্বরান্বিত করছে এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করছে। বিদেশি বিনিয়োগের এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে দেশের উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা আগামীতে আরও বৃদ্ধি পাবে।
বাণিজ্যিক দিক থেকেও চীন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অংশীদার। বাংলাদেশ মূলত চীন থেকে আধুনিক যন্ত্রপাতি, শিল্পকারখানার কাঁচামাল ও প্রযুক্তি আমদানি করে, যা আমাদের দেশীয় শিল্পখাতকে শক্তিশালী করতে প্রত্যক্ষ অবদান রাখছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ যদি চীনের বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারে তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য এবং ওষুধের রপ্তানি আরও বাড়াতে পারে, তবে বাণিজ্য ঘাটতি কাটিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা সম্ভব।
বৈশ্বিক রাজনীতিতে চীন একটি অন্যতম প্রভাবশালী শক্তি। ফলে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বকে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া ও বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগের একটি প্রধান কেন্দ্র বা ‘হাব’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
তবে চীনের সঙ্গে এই নিবিড় সম্পর্কের পাশাপাশি অন্যান্য বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক অংশীদার—যেমন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত, জাপান এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গেও সমদূরত্ব ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা প্রয়োজন। বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার, রেমিট্যান্স এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ কোনো একক দেশের ওপর নির্ভরশীল নয়। অতিরিক্ত একক নির্ভরশীলতা ভবিষ্যতে ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই সব পক্ষের সঙ্গে জাতীয় স্বার্থকে ঊর্ধ্বে রেখে সম্পর্ক বজায় রাখাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
অনেকে মনে করেন, চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখলেই বাংলাদেশের উন্নত দেশে রূপান্তর নিশ্চিত। তবে বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়। চীনের সহযোগিতা একটি বড় অনুঘটক হতে পারে, কিন্তু স্থায়ী উন্নয়নের মূল ভিত্তি হলো দেশের অভ্যন্তরীণ সুশাসন, দক্ষ জনশক্তি, মানসম্মত শিক্ষা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, আইনের শাসন এবং কার্যকর অর্থনৈতিক নীতি। অভ্যন্তরীণ এই সূচকগুলোতে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে শুধু বিদেশি বিনিয়োগ বা ঋণ দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে না।
চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশ অনেক কিছু শিখতে পারে। বিশেষ করে দ্রুত শিল্পায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং রপ্তানিমুখী অর্থনীতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাদের সফল মডেলটি আমাদের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে। এই সুযোগগুলোকে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারলে দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
ভবিষ্যতে বাংলাদেশ যখন উন্নয়নশীল দেশ থেকে আরও উচ্চ আয়ের দেশের পথে পা বাড়াবে, তখন আমাদের চিরাচরিত পররাষ্ট্রনীতি—”সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়”—এর বাস্তব ও কৌশলগত প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠবে। চীনের সঙ্গে ইতিবাচক ও উন্নয়নমুখী সম্পর্ক যেমন আমাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য লাভজনক, ঠিক তেমনি অন্যান্য বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গেও গভীর সহযোগিতা অব্যাহত রাখা দেশের কূটনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করবে।
পরিশেষে বলা যায়, চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য একটি সোনালী সুযোগ। অবকাঠামো, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যের মাধ্যমে দেশ উপকৃত হচ্ছে এবং হবে। তবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন কেবল বাহ্যিক সম্পর্কের ওপর নির্ভর করবে না; বরং তা নির্ভর করবে আমাদের নিজস্ব নীতি, সুশাসন, যোগ্য নেতৃত্ব এবং ভারসাম্যপূর্ণ দূরদর্শী কূটনীতির ওপর। সঠিক পরিকল্পনা ও জাতীয় স্বার্থের সঠিক মূল্যায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ এই দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থানকে আরও সুসংহত করতে সক্ষম হবে।
————————————-
লেখকঃ শিক্ষার্থী,রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

জাহিন আবদুল্লাহ 



















