নওগাঁর রাণীনগরে বাণিজ্যিক মৎস্যখাদ্যের বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব কালো সৈনিক পোকা চাষ করে সাড়া ফেলেছেন প্রতিবন্ধী যুবক নাহিদ হোসেন। উপজেলার লোহাচূড়া গ্রামে প্রথমবারের মতো এ পোকা চাষ শুরু করে সফলতা পেয়েছেন তিনি। পিকেএসএফের স্মার্ট প্রকল্পের কারিগরি সহযোগিতায় স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা ‘মৌসুমী’ নাহিদকে খামার স্থাপনে সহায়তা করেছে।
ইতোমধ্যে কালো সৈনিক পোকার লার্ভা নিজের পুকুরে মাছের খাবার হিসেবে ব্যবহার করে মাছের খাদ্য ব্যয় কমিয়েছেন নাহিদ। পাশাপাশি উৎপাদিত অতিরিক্ত পোকা বিক্রি করে প্রতি মাসে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা আয় করছেন তিনি। তার উদ্যোগে বর্তমানে আরও দুজনের কর্মসংস্থান হয়েছে।
কালো সৈনিক পোকা বাসাবাড়ি, হোটেল ও বাজারের পচনশীল বর্জ্য পুনঃব্যবহার করে উৎপাদন করা যায়। এর লার্ভা বিভিন্ন ধরনের জৈব বর্জ্য খেয়ে বেড়ে ওঠে। ফলে একদিকে যেমন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ভূমিকা রাখে, অন্যদিকে মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করায় চাষিদের উৎপাদন খরচও কমে আসে। পরিবেশবান্ধব এ প্রযুক্তির মাধ্যমে বিষমুক্ত মাছ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
আলো-বাতাস চলাচল করে এমন ঘরে কালো সৈনিক পোকা চাষ করা হয়। প্রজননের পর পোকাগুলো কাঠের স্তরের মধ্যে ডিম পাড়ে। ডিমগুলো হ্যাচিং করে ফোটানোর পর আলাদা জায়গায় রাখা হয়। পরে সেখান থেকে লার্ভা তৈরি হয়। বিভিন্ন ধরনের জৈব বর্জ্য ব্যবহার করে কয়েকটি ধাপে ১৫ থেকে ১৬ দিনের মধ্যে লার্ভা উৎপাদন করা সম্ভব। উপযোগী হওয়ার পর এসব লার্ভা পুকুরে মাছের খাবার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আলাদা করে কোনো বাণিজ্যিক খাবারের প্রয়োজন না হওয়ায় এ পদ্ধতিতে উৎপাদন ব্যয়ও তুলনামূলক কম।
উদ্যোক্তা নাহিদ হোসেন জানান, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা ‘মৌসুমী’ থেকে তার বাবার নামে এক লাখ টাকা ঋণ নিয়ে স্মার্ট পিসিকালচার উপ-প্রকল্পের সহযোগিতায় ছোট পরিসরে কালো সৈনিক পোকা চাষ শুরু করেন। পরে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে স্মার্ট প্রকল্প থেকে ৫০ হাজার টাকা অনুদান পান। ওই অর্থ দিয়ে খামারের পরিসর বাড়ান তিনি।
নাহিদ বলেন, প্রতি কেজি কালো সৈনিক পোকা উৎপাদনে তার খরচ হয় প্রায় ৬৫ টাকা। বিপরীতে প্রতি কেজি ২৫০ থেকে ২৭০ টাকা দরে বিক্রি করা যায়। বর্তমানে তার খামারে প্রতি মাসে ৪০০ থেকে ৫০০ কেজি কালো সৈনিক পোকা উৎপাদন হচ্ছে। নিজের পুকুরের মাছের খাদ্যের চাহিদা মেটানোর পর অতিরিক্ত পোকা বিক্রি করে মাসে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা আয় করছেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, তার এই উদ্যোগ দেখে এলাকার বেকার যুবকেরাও কালো সৈনিক পোকা চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। এর মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি আকারের খামার গড়ে উঠছে। ময়লা-আবর্জনা ব্যবহার করে এ পোকা উৎপাদন করায় পরিবেশ দূষণ কমাতেও এটি ভূমিকা রাখছে। এলাকায় তিনি ‘ব্ল্যাক সোলজার নাহিদ’ নামে পরিচিতি পেয়েছেন বলেও জানান।
মৌসুমী স্মার্ট-পিসিকালচার উপ-প্রকল্পের এমআইএস ও ডকুমেন্টেশন কর্মকর্তা আব্দুর রউফ বলেন, নাহিদ হোসেন তাদের প্রকল্পের একটি অনন্য উদাহরণ। কালো সৈনিক পোকা উৎপাদন পরিবেশবান্ধব ও টেকসই প্রযুক্তি, যা মৎস্যচাষিদের খাদ্য ব্যয় কমানোর পাশাপাশি বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করছে। প্রতিবন্ধী হয়েও নাহিদ যেভাবে এ প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে সফল হয়েছেন, তা অন্যদেরও উৎসাহিত করছে।
তিনি বলেন, কালো সৈনিক পোকার লার্ভা বিভিন্ন ধরনের জৈব বর্জ্য ভক্ষণ করে বেড়ে ওঠে। প্রকল্পের পক্ষ থেকে নাহিদকে নিয়মিত কারিগরি সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। এ প্রযুক্তি আরও বেশি মৎস্যচাষির মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে।

মৌসুমী স্মার্ট-পিসিকালচার উপ-প্রকল্পের প্রকল্প ব্যবস্থাপক ফিরোজ হোসেন বলেন, কালো সৈনিক পোকা বিভিন্ন জৈব বর্জ্য ভক্ষণ করে বেড়ে ওঠে। পরিণত অবস্থায় এর লার্ভা বিকল্প প্রোটিনের উৎস হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। বাসাবাড়ির উচ্ছিষ্ট, ময়লা ও বিভিন্ন জৈব বর্জ্য ব্যবহার করেই এ পোকা উৎপাদন সম্ভব। ফলে বর্জ্য পুনঃব্যবহারের পাশাপাশি পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাবও কমানো যায়।
তিনি জানান, নওগাঁর রাণীনগরের লোহাচূড়া গ্রামে নাহিদ হোসেনকে এ প্রযুক্তি ব্যবহারে সহযোগিতা করা হয়েছে। মাছচাষি ও ভোক্তাদের মধ্যে কালো সৈনিক পোকার উপকারিতা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতেও কাজ করছে তাদের প্রকল্প।
রাণীনগর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা পলাশ চন্দ্র দেবনাথ বলেন, মাছ চাষে বিকল্প প্রোটিনের উৎস হিসেবে কালো সৈনিক পোকা বর্তমানে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় হচ্ছে। নাহিদ হোসেন প্রযুক্তিটি সফলভাবে প্রয়োগ করে যে ফলাফল দেখিয়েছেন, তা প্রশংসনীয়। এতে তার পুকুরে মাছের বৃদ্ধি বাড়ার পাশাপাশি খাদ্য ব্যয়ও কমেছে। একই সঙ্গে তিনি মাসে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা আয় করছেন, যা অন্য মৎস্যচাষিদের জন্য অনুপ্রেরণার উদাহরণ।
তিনি আরও বলেন, শুকনো অবস্থায় কালো সৈনিক পোকার লার্ভা থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ উচ্চমানের প্রোটিন পাওয়া সম্ভব। ফলে এটি প্রাণিজ প্রোটিনের বিকল্প উৎস হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। নাহিদের উদ্যোগকে স্থানীয়ভাবে উৎসাহিত করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ দেওয়া অব্যাহত থাকবে।

অনলাইন ডেস্ক 


















