ঢাকা শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬, ২০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিশ্বকাপের আলোচনার আড়ালে কেপ ভার্দেতে ইসলামের নীরব বিকাশ

blank

বিশ্বকাপ ফুটবলে অংশগ্রহণের সুবাদে সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছে আটলান্টিক মহাসাগরের ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে। তবে ফুটবল উন্মাদনার আড়ালে দেশটিতে নীরবে এগিয়ে চলেছে ইসলামের বিকাশের এক ভিন্ন ইতিহাস। সংখ্যায় অল্প হলেও কেপ ভার্দের মুসলিমরা অর্থনীতি, সামাজিক সম্প্রীতি এবং মানবিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন।

২০২১ সালের জাতীয় আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী, কেপ ভার্দের প্রায় পাঁচ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে মুসলিমের সংখ্যা আনুমানিক পাঁচ হাজার, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ। তাদের অধিকাংশই পশ্চিম আফ্রিকার সেনেগাল, গিনি-বিসাউ ও মালি থেকে আসা অভিবাসী।

রাজধানী প্রাইয়া, বন্দরনগরী মিনদেলো, পর্যটনকেন্দ্রিক সাল ও বোয়া ভিস্তা দ্বীপে মুসলিমদের বসবাস তুলনামূলক বেশি। সুন্নি মতাবলম্বী এসব মুসলিম মূলত খুচরা ব্যবসা, নির্মাণশিল্প, পর্যটনসেবা, পরিবহন ও হস্তশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। তাদের অনেকেই পশ্চিম আফ্রিকার সুফি ধারার—বিশেষ করে তিজানিয়া ও মুরিদ তরিকার—সাংস্কৃতিক প্রভাব বহন করেন, যা তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনেও প্রতিফলিত হয়।

ঔপনিবেশিক যুগে ইসলামের আগমন

কেপ ভার্দেতে ইসলামের ইতিহাস প্রায় সাড়ে পাঁচ শতাব্দী পুরোনো। ১৪৬২ সালে পর্তুগিজরা দ্বীপপুঞ্জে উপনিবেশ স্থাপন করলে এটি দ্রুত আটলান্টিক দাসবাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়। সে সময় সেনেগাম্বিয়া ও আপার গিনি অঞ্চল থেকে আগত মুসলিম ব্যবসায়ী ও ক্রীতদাসদের মাধ্যমে দেশটিতে ইসলামের প্রথম বিস্তার ঘটে।

ওলোফ, মানদিঙ্কা ও ফুলানি জনগোষ্ঠীর বহু মুসলিম আখখেত ও গৃহস্থালি শ্রমে নিয়োজিত ছিলেন। ইতিহাসবিদদের মতে, তাদের অনেকেরই ইসলামি শিক্ষা ও ধর্মীয় জ্ঞান ছিল সমৃদ্ধ।

তবে পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক শাসনামলে ক্যাথলিক ধর্মের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। বহু মুসলিমকে জোরপূর্বক খ্রিস্টধর্ম গ্রহণে বাধ্য করা হয়। কোরআন তেলাওয়াত ও প্রকাশ্যে ধর্মীয় আচার পালনের ওপরও ছিল কঠোর নিষেধাজ্ঞা। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে দেশটিতে কোনো স্থায়ী ইসলামি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি।

স্বাধীনতার পর নতুন সম্ভাবনা

তবুও ইসলামের উপস্থিতি পুরোপুরি বিলীন হয়নি। স্থানীয় ক্রেওল ভাষা ও সংস্কৃতিতে ওলোফ ও মানদিঙ্কা ভাষার কিছু শব্দ এবং পশ্চিম আফ্রিকার মুসলিম ঐতিহ্যের নানা উপাদান আজও সেই ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে। বর্তমানে সরকারি ভাষা পর্তুগিজের পাশাপাশি অভিবাসী মুসলিমদের মধ্যে ফরাসি ও ওলোফ ভাষারও প্রচলন রয়েছে।

১৯৭৫ সালের ৫ জুলাই পর্তুগালের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর কেপ ভার্দের সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়। এর ফলে মুসলিমরা প্রথমবারের মতো স্বাধীনভাবে ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পান।

পরবর্তী সময়ে ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে পর্যটনশিল্পের প্রসার, বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এবং পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধির ফলে মুসলিম অভিবাসীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। ১৯৯০ সালে রাজধানী প্রাইয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় দেশের প্রথম সরকারি স্বীকৃত মসজিদ, যা বর্তমানে মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।

এছাড়া ২০১৪ সালে অন্তত ৫০০ সদস্যবিশিষ্ট ধর্মীয় সংগঠনকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার আইন কার্যকর হলে মুসলিম সংগঠনগুলোও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও বিভিন্ন প্রশাসনিক সুবিধা লাভ করে। এর ফলে কেপ ভার্দেতে মুসলিম সম্প্রদায়ের সাংগঠনিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হয়েছে।

সংখ্যায় ছোট হলেও কেপ ভার্দের মুসলিমরা আজ দেশটির অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, সামাজিক সম্প্রীতি এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। বিশ্বকাপের আলোচনার পাশাপাশি এই নীরব অগ্রযাত্রাও দেশটির একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা।

জনপ্রিয় খবর
blank

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সাংবাদিকের ওপর হামলার দুই বছরেও বিচার হয়নি, ববি প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তায় ক্ষোভ

বিশ্বকাপের আলোচনার আড়ালে কেপ ভার্দেতে ইসলামের নীরব বিকাশ

প্রকাশের সময় : ৭ ঘন্টা আগে
blank

বিশ্বকাপ ফুটবলে অংশগ্রহণের সুবাদে সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছে আটলান্টিক মহাসাগরের ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে। তবে ফুটবল উন্মাদনার আড়ালে দেশটিতে নীরবে এগিয়ে চলেছে ইসলামের বিকাশের এক ভিন্ন ইতিহাস। সংখ্যায় অল্প হলেও কেপ ভার্দের মুসলিমরা অর্থনীতি, সামাজিক সম্প্রীতি এবং মানবিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন।

২০২১ সালের জাতীয় আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী, কেপ ভার্দের প্রায় পাঁচ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে মুসলিমের সংখ্যা আনুমানিক পাঁচ হাজার, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ। তাদের অধিকাংশই পশ্চিম আফ্রিকার সেনেগাল, গিনি-বিসাউ ও মালি থেকে আসা অভিবাসী।

রাজধানী প্রাইয়া, বন্দরনগরী মিনদেলো, পর্যটনকেন্দ্রিক সাল ও বোয়া ভিস্তা দ্বীপে মুসলিমদের বসবাস তুলনামূলক বেশি। সুন্নি মতাবলম্বী এসব মুসলিম মূলত খুচরা ব্যবসা, নির্মাণশিল্প, পর্যটনসেবা, পরিবহন ও হস্তশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। তাদের অনেকেই পশ্চিম আফ্রিকার সুফি ধারার—বিশেষ করে তিজানিয়া ও মুরিদ তরিকার—সাংস্কৃতিক প্রভাব বহন করেন, যা তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনেও প্রতিফলিত হয়।

ঔপনিবেশিক যুগে ইসলামের আগমন

কেপ ভার্দেতে ইসলামের ইতিহাস প্রায় সাড়ে পাঁচ শতাব্দী পুরোনো। ১৪৬২ সালে পর্তুগিজরা দ্বীপপুঞ্জে উপনিবেশ স্থাপন করলে এটি দ্রুত আটলান্টিক দাসবাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়। সে সময় সেনেগাম্বিয়া ও আপার গিনি অঞ্চল থেকে আগত মুসলিম ব্যবসায়ী ও ক্রীতদাসদের মাধ্যমে দেশটিতে ইসলামের প্রথম বিস্তার ঘটে।

ওলোফ, মানদিঙ্কা ও ফুলানি জনগোষ্ঠীর বহু মুসলিম আখখেত ও গৃহস্থালি শ্রমে নিয়োজিত ছিলেন। ইতিহাসবিদদের মতে, তাদের অনেকেরই ইসলামি শিক্ষা ও ধর্মীয় জ্ঞান ছিল সমৃদ্ধ।

তবে পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক শাসনামলে ক্যাথলিক ধর্মের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। বহু মুসলিমকে জোরপূর্বক খ্রিস্টধর্ম গ্রহণে বাধ্য করা হয়। কোরআন তেলাওয়াত ও প্রকাশ্যে ধর্মীয় আচার পালনের ওপরও ছিল কঠোর নিষেধাজ্ঞা। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে দেশটিতে কোনো স্থায়ী ইসলামি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি।

স্বাধীনতার পর নতুন সম্ভাবনা

তবুও ইসলামের উপস্থিতি পুরোপুরি বিলীন হয়নি। স্থানীয় ক্রেওল ভাষা ও সংস্কৃতিতে ওলোফ ও মানদিঙ্কা ভাষার কিছু শব্দ এবং পশ্চিম আফ্রিকার মুসলিম ঐতিহ্যের নানা উপাদান আজও সেই ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে। বর্তমানে সরকারি ভাষা পর্তুগিজের পাশাপাশি অভিবাসী মুসলিমদের মধ্যে ফরাসি ও ওলোফ ভাষারও প্রচলন রয়েছে।

১৯৭৫ সালের ৫ জুলাই পর্তুগালের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর কেপ ভার্দের সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়। এর ফলে মুসলিমরা প্রথমবারের মতো স্বাধীনভাবে ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পান।

পরবর্তী সময়ে ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে পর্যটনশিল্পের প্রসার, বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এবং পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধির ফলে মুসলিম অভিবাসীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। ১৯৯০ সালে রাজধানী প্রাইয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় দেশের প্রথম সরকারি স্বীকৃত মসজিদ, যা বর্তমানে মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।

এছাড়া ২০১৪ সালে অন্তত ৫০০ সদস্যবিশিষ্ট ধর্মীয় সংগঠনকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার আইন কার্যকর হলে মুসলিম সংগঠনগুলোও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও বিভিন্ন প্রশাসনিক সুবিধা লাভ করে। এর ফলে কেপ ভার্দেতে মুসলিম সম্প্রদায়ের সাংগঠনিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হয়েছে।

সংখ্যায় ছোট হলেও কেপ ভার্দের মুসলিমরা আজ দেশটির অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, সামাজিক সম্প্রীতি এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। বিশ্বকাপের আলোচনার পাশাপাশি এই নীরব অগ্রযাত্রাও দেশটির একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা।