জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) প্রেস ক্লাবের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক, ২০২৪–২৫ কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য এবং দৈনিক বরিশাল পত্রিকা–এর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি আবু উবাইদা। তবে ঘটনার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও হামলার বিচার সম্পন্ন করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ সময়ের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক ড. বদরুজ্জামান ভূঁইয়া, অধ্যাপক ড. শুচিতা শরমিন ও অধ্যাপক ড. মো. তৌফিক আলমের পর নতুন উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন অধ্যাপক ড. মামুন অর রশিদ।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৪ জুলাই বিকেল ৫টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি গেটসংলগ্ন এলাকায় জুলাই আন্দোলনের তথ্য সংগ্রহের সময় নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের শান্ত-তমাল-আরাফাত গ্রুপের অনুসারী অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের ২০২১–২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শিশির আহমেদ সুমন, ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ২০১৭–১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শিমুলসহ কয়েকজন আবু উবাইদার ওপর হামলা চালান।

অভিযোগে বলা হয়, সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পরও অভিযুক্তরা তাকে এলোপাতাড়ি মারধর করেন। এ সময় তার মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে ধারণ করা ভিডিও ফুটেজ মুছে ফেলা হয় এবং ঘটনা প্রকাশ করলে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়।
ঘটনার দুই দিন পর, ৬ জুলাই তৎকালীন প্রক্টর অধ্যাপক আব্দুল কাইউম ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়। বিভিন্ন জটিলতা কাটিয়ে অভিযোগ গ্রহণের পর পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. মাহফুজ আলমকে আহ্বায়ক, প্রক্টর অফিসের মনোজ বৈরাগীকে সদস্যসচিব এবং গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ইমরান হোসাইনকে সদস্য করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
তদন্ত চলাকালে কমিটির আহ্বায়ক ড. মাহফুজ আলম উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গেলে তদন্ত কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। পরে অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. হারুন-অর-রশিদকে আহ্বায়ক করে তদন্ত পুনরায় শুরু হয়। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে প্রায় পাঁচ মাস আগে তদন্ত প্রতিবেদন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়া হলেও এখনো কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক মো. হারুন-অর-রশিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে কমিটির সদস্য ও গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ইমরান হোসাইন বলেন, “প্রায় পাঁচ মাস আগে আমরা তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। আমাদের দায়িত্ব শেষ। এখন পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের।”
এদিকে, হামলার প্রধান অভিযুক্ত শিশির আহমেদ সুমনের বিরুদ্ধে একই দিনে রসায়ন বিভাগের ২০২০–২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আরিফুর রহমান নামে আরেক আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীর ওপর হামলার অভিযোগও রয়েছে। সেই অভিযোগও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়া হলেও এখনো তার কোনো নিষ্পত্তি হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে বরিশাল জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও দৈনিক নয়া দিগন্ত–এর ব্যুরো প্রধান আযাদ আলাউদ্দীন বলেন, “আবু উবাইদাসহ সারা দেশে জুলাই আন্দোলনে আহত ও নিহতদের ওপর হামলার সঙ্গে জড়িতদের এখনো বিচারের আওতায় না আনাটা অত্যন্ত দুঃখজনক। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমার অনুরোধ থাকবে, নিহতদের পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তা এবং আহতদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা হোক।”
তিনি আরও বলেন, “বরিশাল জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবে আহত আবু উবাইদার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টে জমা দেওয়ার মাধ্যমে তার জন্য এককালীন আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়েছিল। সরকার তাকে স্বীকৃতি দিলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন উদাসীন আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মেহেদী হাসান সোহাগ বলেন, “বিষয়টি শৃঙ্খলা কমিটির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তারা এ নিয়ে কাজ করছেন।” বিচার কার্যক্রম কবে শেষ হতে পারে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “এটি আমার একার সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। কমিটি তাদের কার্যক্রম শেষ করলে ফলাফল জানা যাবে।”
এ বিষয়ে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. মামুন অর রশিদ বলেন, “আমি বিষয়টি সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নই। তবে এমন ঘটনা অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। তদন্তে কেউ দোষী প্রমাণিত হলে তাকে কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।”
দীর্ঘ দুই বছরেও বিচার না হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি 

















