দেশ স্বাধীন হয়েছে, পেরিয়ে গেছে ৫৫ বছর। কিন্তু আজও মাঝেমধ্যে নিজেকেই প্রশ্ন করি—আমাদের স্বাধীনতার মূল প্রত্যয়টা আসলে কী ছিল? শুধুই কি পাকিস্তানকে পরাজিত করা, নাকি একটি স্বাধীন, মর্যাদাপূর্ণ, মানবিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা?
যদি লক্ষ্য হয়ে থাকে একটি স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র গড়ে তোলা, তাহলে ৩০ লাখ মানুষের আত্মত্যাগ এবং ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম হারানোর বিনিময়ে অর্জিত সেই স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও আমরা কেন নিজেদের অনেক মৌলিক জায়গায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারলাম না?
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ, সংঘাত ও ধ্বংসের পর মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে ঘুরে দাঁড়াতে দেখেছি। ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে তারা নতুন রাষ্ট্র নির্মাণ করেছে, পরিবর্তন করেছে প্রশাসনিক ব্যবস্থা, অবকাঠামো ও নাগরিকসেবা। বাংলাদেশও মাত্র ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে—যা আমাদের ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়।
কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, স্বাধীনতার এত বছর পরও আমরা কেন কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের জায়গায় পৌঁছাতে পারলাম না?
অবশ্যই বাংলাদেশে উন্নয়ন হয়েছে। রাস্তাঘাট, সেতু, কলকারখানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শপিং মলসহ নানা ক্ষেত্রে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ, সততা ও নাগরিক আচরণে কি একই মাত্রায় পরিবর্তন এসেছে?
বরং কোথাও কোথাও মনে হয়, সভ্যতার বাহ্যিক চাকচিক্যের আড়ালে আমরা আরও বেশি অসহিষ্ণু, স্বার্থপর ও অনিয়মপ্রবণ হয়ে উঠছি। ‘সোনার বাংলা’ কথাটি আমরা গর্বের সঙ্গে উচ্চারণ করি। কিন্তু যে দেশের সম্পদ জনগণের কল্যাণে ব্যবহৃত হওয়ার পরিবর্তে ব্যক্তিস্বার্থে লুটপাট হয়, সেই সম্পদকে কতটা অর্থবহভাবে ‘দেশের সম্পদ’ বলা যায়—সেটিও ভাবার বিষয়।
আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে কেন এত ভোগান্তি
আমার আজকের লেখার মূল বিষয় এতটা বিস্তৃত নয়। আমি শুধু আমাদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং বিশেষ করে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যাত্রীসেবা নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই।
আমি নিজেও পৃথিবীর বেশ কয়েকটি দেশ ভ্রমণ করেছি। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের বিমানবন্দর দেখারও সুযোগ হয়েছে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, চীন কিংবা ইউরোপের উন্নত দেশগুলোর বিমানবন্দরের সঙ্গে আমাদের তুলনা না হয় বাদই দিলাম। কিন্তু পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের অনেক প্রাদেশিক বিমানবন্দরের যাত্রীসেবা ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে তুলনা করলেও আমাদের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অনেক বাস্তবতা প্রশ্নের জন্ম দেয়।
বিদেশ থেকে দেশে ফেরার সময় ঢাকার বিমানবন্দরে নামার আগেই অনেক যাত্রীর মনে একধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়—নামার পর কী ধরনের ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হবে?
ইমিগ্রেশন, লাগেজ সংগ্রহ, পরিবেশ, পরিচ্ছন্নতা, বিভিন্ন ধরনের হয়রানি কিংবা সেবার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা—সব মিলিয়ে একজন যাত্রীর দেশে ফেরার আনন্দ অনেক সময় ম্লান হয়ে যায়।
প্রশ্ন হলো, একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একজন যাত্রী কেন এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হবেন?
যে প্রবাসীরা বছরের পর বছর বিদেশের মাটিতে পরিশ্রম করে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন, দেশে ফিরে তাঁদের ন্যূনতম সম্মান ও স্বস্তি পাওয়ার পরিবর্তে কেন ভোগান্তির শিকার হতে হবে? কষ্টার্জিত মালামাল নিয়ে তাঁদের কেন উদ্বিগ্ন থাকতে হবে? কোনো অভিযোগ থাকলে তার দ্রুত প্রতিকার পাওয়ার ব্যবস্থা কোথায়?
হজ শেষে দেশে ফেরা হাজিরা কেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগেজ ও জমজমের পানির জন্য অপেক্ষা করবেন? বিদেশি পর্যটক কিংবা দেশের নাগরিক—যে-ই একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবেশ করুন না কেন, পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা ও সেবার মান দেখে তাঁর মনে আস্থা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
কিন্তু সেই প্রথম অভিজ্ঞতাই যদি হয় ভোগান্তির, তাহলে আমাদের আন্তর্জাতিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক।
ভিআইপি প্রটোকল, নাকি সাধারণ যাত্রীর অধিকার
আরেকটি বিষয়ও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের করের টাকায় রাষ্ট্র পরিচালিত হয়, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেওয়া হয়, জনপ্রতিনিধিদের সুযোগ-সুবিধার ব্যয়ও জনগণের অর্থ থেকেই বহন করা হয়। তাহলে সেই জনগণের জন্য একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ন্যূনতম মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা কেন এত কঠিন?
ভিআইপি প্রটোকল থাকবে, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ও আলাদা ব্যবস্থা থাকবে—এটি অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে সাধারণ যাত্রীকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে, হয়রানির শিকার হতে হবে কিংবা প্রয়োজনীয় সেবার জন্য অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।
ভিআইপি সুবিধা থাকতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে সাধারণ নাগরিকের অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে। একটি রাষ্ট্রের মান শুধু তার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য কতটা সুযোগ-সুবিধা রয়েছে, তা দিয়ে বিচার করা যায় না; বরং সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রীয় সেবা পেতে কতটা সম্মান ও স্বস্তি পান, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সমস্যাটা আসলে কোথায়?
প্রশ্নটি তাই শুধু বিমানবন্দরের নয়; প্রশ্নটি আমাদের মানসিকতা ও প্রশাসনিক সংস্কৃতিরও।
একটি বিমানবন্দর কেবল একটি ভবন, রানওয়ে কিংবা ইমিগ্রেশন কাউন্টার নয়। এটি একটি দেশের প্রবেশদ্বার। একজন বিদেশি যখন প্রথমবার বাংলাদেশে আসেন, তখন বিমানবন্দরে পাওয়া অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই তিনি অনেকটা ধারণা তৈরি করেন দেশটি সম্পর্কে।
একজন প্রবাসী যখন দীর্ঘদিন পর নিজের দেশে ফেরেন, তখন বিমানবন্দরই তাঁর কাছে দেশের প্রথম অভ্যর্থনাস্থল।
তাহলে সেই অভ্যর্থনাস্থল কেন ভোগান্তির প্রতীক হবে?
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও কেন আমাদের এমন মৌলিক প্রশ্ন করতে হবে? কেন কোনো সরকারই দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে যাত্রীসেবার সমস্যাগুলো স্থায়ীভাবে সমাধান করতে পারছে না? কেন অনিয়মের অভিযোগ বারবার উঠবে, অথচ তার কার্যকর প্রতিকার নিয়ে মানুষের আস্থা তৈরি হবে না?
আগে বদলাতে হবে আমাদের নিজেদের
পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে শুধু বড় বড় স্থাপনা নির্মাণ করলেই হবে না। আগে বদলাতে হবে আমাদের নিজেদের। বদলাতে হবে আমাদের মনমানসিকতা, দায়িত্ববোধ এবং নাগরিক চরিত্র।
চুরি, দুর্নীতি, লুটপাট, অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি কিংবা দায়িত্বে অবহেলাকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দেশের সম্পদের প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে। মনে রাখতে হবে—দেশের স্বার্থের চেয়ে কোনো ব্যক্তির স্বার্থ বড় হতে পারে না।
সরকার যাবে, সরকার আসবে। নতুন পরিকল্পনা হবে, নতুন প্রকল্প হবে। কিন্তু অনিয়মের শিকড় যদি অক্ষত থাকে, তাহলে শুধু সরকার পরিবর্তনের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না।
তাই প্রয়োজন অনিয়মের শিকড় খুঁজে বের করা, দায়ীদের চিহ্নিত করা এবং যথাযথ জবাবদিহির আওতায় আনা। প্রয়োজন এমন একটি প্রশাসনিক ও সামাজিক সংস্কৃতি, যেখানে দায়িত্ব পালন করা হবে কর্তব্যবোধ থেকে—ভয়, চাপ কিংবা ব্যক্তিস্বার্থ থেকে নয়।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর আমাদের প্রশ্নটি তাই শুধু—আমরা কতটা উন্নত হলাম?
প্রশ্ন হওয়া উচিত—আমরা মানুষ হিসেবে কতটা বদলালাম?
কারণ উন্নত ভবন, প্রশস্ত সড়ক, উড়ালসড়ক কিংবা আধুনিক বিমানবন্দর একটি দেশের বাহ্যিক অবয়ব বদলাতে পারে। কিন্তু একটি দেশকে সত্যিকার অর্থে উন্নত করে তার মানুষের সততা, দায়িত্ববোধ, মানবিকতা ও দেশপ্রেম।
স্বাধীনতার প্রকৃত সার্থকতা সেদিনই দৃশ্যমান হবে, যেদিন দেশের একজন সাধারণ নাগরিক নিজের দেশকে নিয়ে গর্ব করার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সেবার প্রতিটি স্তরে মর্যাদা, স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা অনুভব করবেন।

অনলাইন ডেস্ক 

















