1. chalanbeel.probaho@gmail.com : News :
  2. khokanhaque.du@gmail.com : khokan :
বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ০৩:৪৯ অপরাহ্ন

মতামত
স্বাধীন ফিলিস্তিনে আমি একদিন গাজার মানুষের দেওয়া ধার শোধ করব

জেরেমি করবিন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৯ নভেম্বর, ২০২৩
  • ৭৯ বার পঠিত

২০১৩ সালের শুরুর দিকে আমি শেষবারের মতো আল-শাতি শরণার্থীশিবিরে গিয়েছিলাম। শিবিরটির অবস্থান ছিল গাজার উত্তরাংশে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের ধার ঘেঁষে। আল-শাতির একটা নাটুকে নামও আছে, ‘বিচ-ক্যাম্প’। বড় বড় রঙিন ছাতার নিচে ফেরিওয়ালাদের ফলমূল বিক্রি করতে দেখেছিলাম। সরু গলিতে বেশ কটি বিড়াল ঘুমোচ্ছিল। আর ছাউনির নিজে শিশুরা ব্যস্ত ছিল দড়িলাফ খেলায়।

১৯৪৮ সালের নাকবায় বাস্তুচ্যুত সাড়ে সাত লাখ মানুষকে নিয়ে বিচ ক্যাম্প যাত্রা শুরু করেছিল। প্রথমে এই শিবিরের জনসংখ্যা ছিল ২৩ হাজার। পরবর্তী সাত দশকে এই সংখ্যা ৯০ হাজারে গিয়ে দাঁড়ায়। এত মানুষ ঠাসাঠাসি করে দশমিক ৫ বর্গকিলোমিটার জমিতে বাস করেন। লন্ডনের সিটি সেন্টারের তুলনায় এই শিবিরের জনসংখ্যা ৭০ গুণ বেশি।

গাজার মানুষ ১৬ বছর ধরে অবরুদ্ধ অবস্থায় আছেন। গাজার ভেতর থেকে কোনো ব্যক্তি বা পণ্য বাইরে যাওয়া বা বাইরে থেকে ভেতরে আসা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে ইসরায়েলি দখলদার বাহিনী। বিচ ক্যাম্পও এর ব্যতিক্রম নয়। এখানকার মানুষেরা জাতিসংঘের ত্রাণ ও কর্মসংস্থার অনুদান ও সেবার ওপর নির্ভর করে বাঁচেন। এর বাইরে আছে কিছু স্বাস্থ্যসেবা ও খাদ্য সরবরাহ কেন্দ্র এবং স্কুল।

বিচ ক্যাম্প প্রাথমিক বিদ্যালয়টি সুন্দর, সাজানো-গোছানো। আমি ছাদ পর্যন্ত উঠেছিলাম। ওখান থেকে ইসরায়েলের তোলা বেষ্টনীর একাংশ দেখা যায়। আর সাগরে দেখা যায় ইসরায়েলের টহল নৌকা। ওদের কাজ ফিলিস্তিনি জেলেরা যেন ছয় নটিক্যাল মাইলের বাইরে যেতে না পারেন, তা নিশ্চিত করা।

স্কুল পরিচালনার দায়িত্বে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা ছিলেন উদ্দীপনায় ভরপুর আর কর্মঠ। তাঁদের দর্শন ছিল আবিষ্কার, সংগীত, নাটক আর শিল্পের দুনিয়া তৈরি করে শিশুদের একটা শান্ত পরিবেশে নিয়ে যাওয়া। কয়েকজন ছাত্রছাত্রী আমাকে তাদের কাজ দেখিয়েছিল। আমি ওদের আঁকাআঁকির খাতা দেখেছিলাম। ওতে প্লেন, নিরাপত্তাবেষ্টনী আর বোমার ছবি। তবে অন্য রকম কিছু ছবিও ছিল । বাবা-মা, ভাইবোন আর বন্ধুদের ছবি এঁকেছিল কেউ কেউ। সব শিশুই নিদারুণ একটা যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছিল, তারপরও ওদের আকাঙ্ক্ষা ছিল শেখার, শেখানোর ও একসঙ্গে খেলাধুলা করার।

আমাকে বলা হয়েছিল, অল্প কয়েক দিন পরই গাছে জলপাই আর অন্য ফল আসবে। আমি এখনো আশা ছাড়িনি। জলপাই ও ফল নিশ্চয়ই ফলবে একদিন। গাজার মানুষ তাঁদের আনন্দ, সমানুভূতি আর মানবতা ধার দিয়েছেন আমাকে। আমি আশা করি, একদিন মুক্ত, স্বাধীন ফিলিস্তিনে সেই ধার আমি শোধ করে দেব।
দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাসের শোচনীয় হামলার দুই দিন পর ইসরায়েলিরা বিচ ক্যাম্পের ওপর বোমা হামলা চালায়। এই শিবিরে এটাই ওদের প্রথম হামলা নয়, ২০২১-এর মে মাসে বোমা হামলায় এই শিবিরের ১০ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে আটজনই ছিল শিশু। এইবার এই শিবির তিন দফায় হামলার শিকার হয়।

গাজায় যখন বোমা হামলা শুরু হয়, তখন আমার বিচ ক্যাম্পের স্কুলটার কথা মনে পড়ল। আমি জানি না, স্কুলটা আর টিকে আছে কি না। জানি না ওই শিশুরা আর তাদের শিক্ষকেরা বেঁচে আছেন কি না—আমি জানি না।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী প্রায় সাড়ে ২২ লাখ জনসংখ্যা অধ্যুষিত ছোট্ট একটুকরা ভূমিতে ২৫ হাজার টন বোমা ফেলেছে। তারা বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঠেকাতে চাইছে, তেমন কোনো অর্থবহ চেষ্টা দেখা যায়নি। গাজায় ৯ হাজার ৯০০ মানুষ নিহত হয়েছেন, যাঁদের মধ্যে ৪ হাজার ৮০০ জন শিশু।

অবরুদ্ধ এই ভূখণ্ডে এখনো যাঁরা আছেন, তাঁদের বেঁচে থাকার রসদ—পানি, জ্বালানি, খাবার, ওষুধ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। চিকিৎসকেরা অবশ না করেই অস্ত্রোপচার করছেন। বিদ্যুৎ ফুরিয়ে আসছে। ইনকিউবেটরে থাকা নবজাতকদের জীবনশঙ্কায় মায়েরা কাতর। মানুষ সমুদ্রের পানি খেতে বাধ্য হচ্ছেন। ১০ লাখের বেশি মানুষ এখন ঘরছাড়া।

হামাসের হামলায় ১ হাজার ৪০০ ইসরায়েলি নিহত হয়েছেন। জিম্মি হয়ে আছেন আরও ২০০ জন। পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ এবং নিন্দনীয়। ভুক্তভোগী ও জিম্মিদের মধ্যে অল্পবয়স্ক নারী-পুরুষ আছেন, যাঁরা গান শুনতে গিয়েছিলেন। তাঁরা কারও ভাইয়ের ছেলে বা ভাইয়ের মেয়ে। তাঁদের কেউ অলংকারের নকশা করতেন। কেউ কেউ কাজ করতেন কারখানায়। তাঁদের মধ্যে শান্তিকামী মানুষ ছিলেন। এসব মানুষের স্বজনদের তীব্র বেদনা বয়ে বেড়াতে হবে আজীবন।

কিন্তু এই হামলা দিয়ে ফিলিস্তিনের মানুষের ওপর নির্বিচার বোমা হামলা, তাঁদের খাবার বন্ধ করে দেওয়ার পক্ষে সাফাই গাওয়া যায় না। যে ঘৃণ্য অপরাধের সঙ্গে তাঁরা জড়িত নন, সে অপরাধে তাঁদের শাস্তি হচ্ছে। ভয়াবহ ওই ঘটনার পর আমরা উত্তেজনা প্রশমন ও শান্তির কথা বলেছিলাম। উল্টো দিকে সারা বিশ্বের রাজনীতিবিদেরা আত্মরক্ষার অধিকার আছে, এই যুক্তি দেখালেন। তাঁরা ইসরায়েলকে ফিলিস্তিনের মানুষকে খুন ও অভুক্ত রেখে হত্যার সবুজ সংকেত দিলেন।

গাজার প্রত্যেক মানুষের নাম আছে, আছে চেহারাও। গাজার ইনকিউবেটরে ছটফট করা নবজাতকের জন্য আমরা কাঁদি, যেমন কাঁদি দুর্ঘটনায় নিহত একজন বৃদ্ধের জন্য। আমরা সুন্দর কিছু প্রাণ, সৃষ্টিশীল জীবনের খোয়া যাওয়ায় বিপন্ন বোধ করি।

আমরা এমন কিছু শিল্পী হয়তো হারিয়েছি, যাঁদের চিত্রকর্ম আমাদের দেখার সুযোগ হলো না, যাঁদের গান আমাদের শোনা হলো না, যাঁদের লেখা বই আমাদের আর পড়া হলো না। এসব মানুষের মধ্যে তাঁরাও হয়তো ছিলেন, যাঁরা কুনাফা বানাতেন। তাঁদের হাতে তৈরি কুনাফা আমাদের খাওয়া হলো না। শিক্ষকদের কাছ থেকে শেখা হলো না।

আমি যত দূর মনে করতে পারি, গাজা মানেই টিভি স্ক্রিনে দেখানো ধ্বংসাবশেষ আর হতাশা। কিন্তু এই ধ্বংসাবশেষের নিচে আসলে নিঃশব্দে, সবার অগোচরে চাপা পড়ে আছে আমাদের মানবতা। সকালের কফি, ঈষদুষ্ণ পানিতে গা ভেজানো, কেনাকাটা করতে দূরে কোথাও যাওয়া, তাস পেটানো, বিছানার পাশে রাখা গল্পের বই। বন্ধুত্ব, মন ভাঙা, ভালোবাসা, হতাশা, বিরক্তি ও উদ্বেগ। স্কুল, মসজিদ, থিয়েটার, বিশ্ববিদ্যালয়, গ্রন্থাগার, খেলার মাঠ ও হাসপাতাল। আশা, স্বপ্ন, ভয়, স্নেহ, আনন্দ। আমরা গণমৃত্যু প্রত্যক্ষ করছি। আমরা একটা সংস্কৃতি, একটা পরিচয়, একটা জাতিকে পৃথিবীর বুক থেকে মুছে যাওয়া দেখছি।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) গণমৃত্যু কখন ‘গণহত্যা’ হবে, সে সম্পর্কে কিছু শর্ত বেঁধে দিয়েছেন। হত্যা; ভয়ংকর শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি; জীবন ধ্বংস হতে পারে, এমন কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি করা; শিশু জন্ম নিরোধ করার পদ্ধতি জোর করে চাপিয়ে দেওয়া বা শিশুদের বাস্তুচ্যুত করা গণহত্যার নিয়ামক। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাদের উদ্দেশ্য থাকে ধ্বংস, আংশিক বা পুরোপুরি।

২ নভেম্বর জাতিসংঘের সাত বিশেষ দূত বলেছেন, গাজায় যা ঘটে চলেছে, তা ফিলিস্তিনিদের গণহত্যার ঝুঁকিতে ঠেলে দিচ্ছে বলে তাঁরা মনে করেন। এই বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ অফিসের পরিচালক ক্রেইগ মখিবার পদত্যাগ করেন। তিনি বলেন, পাঠ্যপুস্তকে গণহত্যার যে সংজ্ঞা আছে, গাজার ভয়াবহ পরিস্থিতির সঙ্গে তা পুরোপুরি মিলে যায়। গাজায় দুর্বার গতিতে যে ধ্বংসযজ্ঞ চলছে তার উদ্দেশ্য, ফিলিস্তিনিদের শেষ চিহ্ন পর্যন্ত ধ্বংস করে দেওয়া।

ক্রেইগ তাঁর পদত্যাগপত্রে লিখেছেন, আরব হওয়ায় ফিলিস্তিনিদের পাইকারি হারে খুন করা হচ্ছে, পশ্চিম তীরে তাঁদের বাড়িঘর দখল করা হচ্ছে। ইসরায়েল সরকার ও সেনাবাহিনী কী চাইছে, তা তাঁরা বিবৃতি দিয়ে জোর গলায় বলেছেন।

ক্রেইগ আলাদাভাবে ইসরায়েল সরকার ও সামরিক বাহিনীর কোনো কর্মকর্তার কথার উদ্ধৃতি দেননি। কারণ, এত এত উদ্ধৃতি দেওয়া যায় যে তা এক চিঠিতে আঁটবে না। তবে তিনি ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গিভিরের প্রসঙ্গ তুলতে পারতেন। বেন গিভির এক পোস্টে লিখেছিলেন, ‘যত দিন পর্যন্ত না হামাস জিম্মিদের মুক্তি দিচ্ছে, গাজায় শুধু একটি জিনিসই ঢুকবে আর তা হলো বিস্ফোরক। বিমানবাহিনী বোমা ফেলবে, এক আউন্স মানবিক সহায়তাও নয়।’

অথবা তিনি ইসরায়েলের ক্ষমতাসীন লিকুদ পার্টির সংসদ সদস্য গালিত ডিস্তেল আতবারিয়ানের বক্তব্য উদ্ধৃত করতে পারতেন। গালিত পৃথিবীর বুক থেকে গাজাকে মুছে ফেলা উচিত বলে মন্তব্য করেছিলেন।

গণহত্যা এমন একটি শব্দ, যা খুব সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা উচিত। ইতিহাসে এমন অনেক বীভৎস ঘটনা ঘটেছে, যা গণহত্যা শব্দটির ব্যবহার ছাড়াই বীভৎসতার সাক্ষ্য দেয়। গণহত্যা শব্দটির একই আইনি সংজ্ঞা আছে, তার একটি আইনগত ভিত্তি আছে। সে কারণে এ বিষয়ের আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা আমাদের গণহত্যা শব্দটি ব্যবহার করতে নিষেধ করছেন।

আমাদের এখন চুপ করে বসে থেকে তাঁদের কথা শোনা উচিত। এ কারণে আমাদের অবিলম্বে যুদ্ধ বিরতি চাই, সেই সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) অনুসন্ধানও শুরু হওয়া প্রয়োজন।

আইসিসির শুধু গণহত্যার অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা উচিত হবে না; বরং গত মাস থেকে যতগুলো পক্ষ যুদ্ধাপরাধ করেছে বলে অভিযোগ উঠছে, সব কটির পক্ষের কার্যক্রম খতিয়ে দেখা উচিত। এই তদন্ত আহ্বান করার কর্তৃত্ব ও দায়িত্ব দুই-ই আছে যুক্তরাজ্যের।

এখন পর্যন্ত আমাদের চোখের সামনে যে নারকীয় হামলা চলছে, তার তদন্ত চাওয়ার দাবি যুক্তরাজ্য প্রত্যাখ্যান করে আসছে। গাজার এই গাঢ় অন্ধকারের সময় কেটে যাবে, কিন্তু দায়মুক্তি চিরস্থায়ী। আমাদের সরকার বরং ইসরায়েলি সেনাবাহিনী যেন এই অন্ধকারে নির্বিঘ্নে এই অপরাধ ঘটাতে পারে, তার বন্দোবস্ত করে যাচ্ছে।

যত দিন পর্যন্ত না যুদ্ধবিরতি হচ্ছে, তত দিন পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে। জিম্মিদের মুক্তির জন্য। গাজাকে অবরোধমুক্ত করার জন্য। দখলদারির ইতি টানার জন্য। আমরা এই দাবি তুলছি, কারণ আমরা জানি, ফিলিস্তিনিদের কৌতূহল, তাদের সৃষ্টিশীলতা, তাদের মহানুভবতা ঝুঁকিতে পড়েছে।

আমার মনে আছে, স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে আমরা একটা খাদ্য উৎপাদন প্রকল্প দেখেছিলাম। প্রকল্পটির ব্যাপ্তি সাবেক ইসরায়েলি বসতির ৫০ হেক্টর এলাকাজুড়ে। ইসরায়েলিরা এই বসতি ছেড়ে যাওয়ার আগে তাঁদের ভবনগুলো ধসিয়ে দিয়ে গেছেন। সেই ধ্বংসাবশেষকে একটি সমবায় কৃষি উদ্যোগে রূপান্তর করেছিলেন ফিলিস্তিনিরা।

আমাকে বলা হয়েছিল, অল্প কয়েক দিন পরই গাছে জলপাই আর অন্য ফল আসবে।

আমি এখনো আশা ছাড়িনি। জলপাই ও ফল নিশ্চয়ই ফলবে একদিন। গাজার মানুষ তাঁদের আনন্দ, সমানুভূতি আর মানবতা ধার দিয়েছেন আমাকে। আমি আশা করি, একদিন মুক্ত, স্বাধীন ফিলিস্তিনে সেই ধার আমি শোধ করে দেব।

*জেরেমি করবিন যুক্তরাজ্য পার্লামেন্টের সদস্য। লেবার পার্টির সাবেক নেতা ও মানবাধিকারকর্মী।
আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

সূত্রঃপ্রথম আলো

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..

সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত