বাংলাদেশ আজ জনসংখ্যা ঘনত্বে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি। প্রায় ১৭ কোটি মানুষের এই দেশে তরুণের সংখ্যা বিপুল—যা একদিকে যেমন বিশাল সম্পদ, অন্যদিকে হতে পারে বোঝা, যদি আমরা তাদের দক্ষতাহীন অবস্থায় ফেলে রাখি। আমাদের আজকের চ্যালেঞ্জ হচ্ছে—এই জনসংখ্যাকে প্রকৃত জনশক্তিতে রূপান্তরিত করা। আর সে লক্ষ্য অর্জনের একমাত্র কার্যকর পথ হলো সত্যিকারের কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন।
নামসর্বস্ব শিক্ষা নয়, চাই বাস্তব দক্ষতা
দুঃখজনকভাবে, দেশে অসংখ্য কারিগরি প্রতিষ্ঠান থাকলেও এর বেশিরভাগই কাগজে–কলমে। শিক্ষার্থীরা সার্টিফিকেট পেলেও বাস্তব দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। ফলে তারা চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা করতে ব্যর্থ হয়। বিদেশগামী অনেক শ্রমিকও শুধুমাত্র প্রশিক্ষণহীনতার কারণে নিম্ন মজুরির কাজে নিযুক্ত হয়। অথচ, যদি তারা মানসম্মত প্রশিক্ষণ ও বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারত, তবে দেশের রেমিট্যান্স আয় দ্বিগুণ হতো।
নামসর্বস্ব কারিগরি প্রতিষ্ঠান চালিয়ে শুধুমাত্র সংখ্যা বাড়ানো কোনো উন্নয়ন নয়। এই প্রক্রিয়া কেবল বেকার সনদধারীর সংখ্যা বাড়ায়, দক্ষ মানবসম্পদ নয়। তাই এখন সময় এসেছে ‘ডিগ্রি’ নয়, ‘দক্ষতা’কে মূল্যায়নের।
বিশ্ববাজারে দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা
বর্তমান বিশ্বে শ্রমবাজার দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপানসহ নানা দেশে দক্ষ শ্রমিকের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কিন্তু সেই বাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এখনও সীমিত।
ভারত, ফিলিপাইন বা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো ইতোমধ্যে দক্ষতা-নির্ভর জনশক্তি দিয়ে বিশ্বের শ্রমবাজারে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। তারা শুধু প্রবাসী শ্রমিক পাঠাচ্ছে না, বরং প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও কারিগরি সেবার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে।
বাংলাদেশও চাইলে এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারে, যদি দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে আন্তরিকতা ও বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া হয়। শুধু ইট-সিমেন্টের ভবন নয়, দরকার আধুনিক ল্যাব, প্রশিক্ষিত শিক্ষক এবং শিল্পখাতের সঙ্গে কারিগরি শিক্ষার সমন্বয়।
শিক্ষা ও শিল্পের মধ্যে সেতুবন্ধন
কারিগরি শিক্ষাকে শুধু শ্রেণিকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। শিক্ষার্থীদের বাস্তব শিল্পকারখানায়, উৎপাদন ইউনিটে ও প্রযুক্তি কেন্দ্রে হাতে-কলমে কাজ শেখাতে হবে। এতে তারা শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতাও অর্জন করবে।
যেমন—একজন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার যদি কোনো প্রকৃত প্রকল্পে কাজ করার সুযোগ পায়, তবে তার শেখার মান ও আত্মবিশ্বাস উভয়ই বৃদ্ধি পাবে। শিল্পখাতের সঙ্গে এমন ইন্টার্নশিপ বা অ্যাপ্রেন্টিসশিপ প্রোগ্রাম চালু করলে কারিগরি শিক্ষা বাস্তবমুখী হবে এবং শিক্ষার্থীরা কর্মসংস্থানের জন্য প্রস্তুত হবে।
কারিগরি শিক্ষায় সংস্কার জরুরি
কারিগরি শিক্ষার পাঠ্যক্রম অনেকাংশে পুরনো। আধুনিক প্রযুক্তি, অটোমেশন, রোবোটিকস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা ডিজিটাল দক্ষতা নিয়ে পাঠ্যসূচিতে পরিবর্তন আনতে হবে। একইসাথে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক কারিগরি শিক্ষক নিজেরাই আধুনিক যন্ত্রপাতি বা সফটওয়্যারের সঙ্গে পরিচিত নন। ফলে শিক্ষার্থীরা বইয়ের বাইরে বাস্তব জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হয়। প্রত্যেক কারিগরি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, দক্ষ প্রশিক্ষক, আধুনিক ল্যাবরেটরি, ও উৎপাদনভিত্তিক শিক্ষা পদ্ধতি চালু করতে হবে।
দক্ষতা রপ্তানিতে নতুন দিগন্ত
বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রায় ৮০ লক্ষাধিক প্রবাসী শ্রমিকের মাধ্যমে বিশাল পরিমাণ রেমিট্যান্স উপার্জন করছে। কিন্তু এর মধ্যে অধিকাংশই অদক্ষ শ্রমিক। যদি এই শ্রমিকদের আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ দিয়ে পাঠানো যায়, তাহলে একই শ্রমিক দ্বিগুণ আয় করতে পারবে। ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়বে, পারিবারিক আয় বৃদ্ধি পাবে, এবং জাতীয় অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে। সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও জাপানের মতো দেশে বাংলাদেশি দক্ষ কর্মীর জন্য বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। আমাদের উচিত এই বাজারগুলো লক্ষ্য করে দক্ষতা রপ্তানি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা।
নারী কারিগরি শিক্ষায় জোর দিতে হবে
কারিগরি শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ এখনও খুবই সীমিত। অথচ নারীদের অন্তর্ভুক্ত করা গেলে সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বহুগুণে বাড়বে। ফ্যাশন ডিজাইন, ইলেকট্রনিক্স, আইটি, বায়োটেকনোলজি, হেলথ কেয়ার ইত্যাদি খাতে নারীদের প্রশিক্ষণ দিলে তারা আত্মনির্ভর হতে পারবে এবং পরিবারেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।
সরকার ও বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগ দরকার
শুধু সরকারি উদ্যোগে কারিগরি দক্ষতা অর্জন সম্ভব নয়। বেসরকারি খাতকে যুক্ত করতে হবে। শিল্পমালিকরা যদি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করে নিজেদের প্রয়োজনীয় জনবল তৈরি করে, তবে তা হবে উভয়ের জন্য লাভজনক। এছাড়াও, এনজিও, বিদেশি সহযোগী সংস্থা ও উন্নয়ন অংশীদারদের সহযোগিতা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে দক্ষতা উন্নয়ন মাস্টার প্ল্যান গ্রহণ করা জরুরি। দক্ষ যুবকই উন্নত বাংলাদেশের স্থপতি যুব সমাজের ভেতরেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। তাদের সঠিক প্রশিক্ষণ, আধুনিক শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ দিতে পারলেই দেশ এগিয়ে যাবে। আজকের তরুণ যদি একেকজন দক্ষ প্রযুক্তিবিদ, ইঞ্জিনিয়ার, ডিজাইনার বা উদ্যোক্তা হয়—তবে বাংলাদেশ কোনোভাবেই পিছিয়ে থাকবে না।
উপসংহার
শুধু নামসর্বস্ব কারিগরি প্রতিষ্ঠান নয়, দরকার মানসম্পন্ন দক্ষতা শিক্ষা। জনসংখ্যাকে প্রকৃত অর্থে জনশক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারলেই বাংলাদেশ হবে এক সমৃদ্ধ, আত্মনির্ভর রাষ্ট্র।
কারিগরি শিক্ষার মানোন্নয়নই হবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সর্বোত্তম বিনিয়োগ—যা একদিন বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে সত্যিকারের দক্ষ জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।
লেখকঃ শিক্ষক ও সমাজকর্মী
mirzashafiq15@gmail.com

মির্জা শফিকুল ইসলাম 
























