ঢাকা রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৩ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

শুঁটকির ঘ্রাণে ভেসে থাকা জীবন: চলনবিলের কর্মযজ্ঞ

  • রাজিবুল হক
  • প্রকাশের সময় : ০৭:৫৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬
  • 55
blank

চলনবিলে বর্ষা মানেই শুধু জল আর ঢেউ নয়—বর্ষার সঙ্গে ভেসে আসে জীবনের সম্ভাবনাও। বিলে ছলছল করে ওঠে দেশীয় ছোট-বড় মাছ। সেই মাছ ঘিরেই বছরের একটি নির্দিষ্ট সময় জীবনের হিসাব মেলান বিলপাড়ের মানুষজন। আশ্বিন থেকে মাঘ—এই সময়টুকুতে যেন নতুন করে জেগে ওঠে চলনবিলসংলগ্ন শুঁটকির চাতালগুলো। প্রখর রোদের নিচে মাছ শুকানোর দৃশ্য একদিকে যেমন শ্রমের, অন্যদিকে তেমনি টিকে থাকার এক অনন্য গল্প।

চাটমোহর, তাড়াশ, উল্লাপাড়া, গুরুদাসপুর—চলনবিলের এই জনপদগুলোতে শুঁটকি শুধু খাদ্য নয়, এটি জীবিকার ভাষা। প্রায় ৭০ থেকে ৮৫ জন মৎস্যজীবী-ব্যবসায়ী বছরের এই সময়ে দেশীয় নানা প্রজাতির মাছ দিয়ে তৈরি করেন স্বাস্থ্যসম্মত শুঁটকি। তাদের হাতে গড়া এই শিল্প আজ বহু পরিবারকে দাঁড় করিয়েছে নিজের পায়ে। রোদে শুকানো মাছের মতোই ধীরে ধীরে পুষ্ট হয় সংসার, পূরণ হয় সন্তানের পড়াশোনা আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন।

পাবনার চাটমোহরের হান্ডিয়াল পূর্বপাড়ায় গেলে এখনো দেখা মেলে এক জীবন্ত ইতিহাসের—পলান প্রামাণিক। ছয় দশকের বেশি সময় ধরে তিনি আগলে রেখেছেন চলনবিলের শুঁটকি তৈরির ঐতিহ্য। যৌবনে নীলফামারীর সৈয়দপুরে এক শুঁটকি ব্যবসায়ীর কাছ থেকে শেখা কৌশলই বদলে দেয় তাঁর জীবনের গতিপথ।

একসময় অতিরিক্ত মাছের জোগানে বাজারে মাছ নষ্ট হয়ে যেত। সেই সংকট থেকেই জন্ম নেয় নতুন ভাবনা—সস্তায় মাছ কিনে রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করা। প্রথম বছরেই লাভ আসে। তারপর আর থামেনি পথচলা। বড় হয়েছে চাতাল, বদলেছে সংসারের চেহারা। আজ বাবার পথ ধরেই তিন দশকের বেশি সময় ধরে শুঁটকির পেশায় যুক্ত ছেলে মোফাজ্জল হোসেন প্রামাণিকও।

আষাঢ়ে আকাশে মেঘ জমতেই শুরু হয় প্রস্তুতি। বাঁশের বানা, খুঁটি, মাছঘর, ডালা, হাতা, টুপড়ি—সব গুছিয়ে নেওয়া হয় যত্নে। ভাদ্রের মাঝামাঝি অপেক্ষাকৃত উঁচু জায়গায় বসে শুঁটকির চাতাল। বাজারে যখন পুঁটি, ট্যাংরা, টাকি, বোয়াল, শোল, খলিশা, চান্দা, গুচি কিংবা ইছা মাছের জোয়ার নামে, তখনই শুরু হয় শুঁটকি তৈরির আসল কর্মযজ্ঞ।

বিলের কাদা ঠেলে দলে দলে নারী-পুরুষ শ্রমিক আসেন চাতালে। কারও হাতে ছুরি-বঁটি, কেউ লবণ মেশান, কেউ কাঠের হাতায় মাছ উল্টে দেন—যাতে রোদে সমানভাবে শুকায়। একটি মাঝারি চাতালে মৌসুমে তৈরি হয় ৩০০ থেকে ৩৫০ মণ শুঁটকি। প্রায় চার কেজি মাছ শুকিয়ে পাওয়া যায় এক কেজি শুঁটকি। রোদে পাততে পাততে দিনের পর দিন ধরে তৈরি হয় সেই সুগন্ধি দেশীয় শুঁটকি।

মহিষলুটি, খলিশাগাড়ী, বিলসা, সলঙ্গা, চারঘাট, সিংড়া এলাকার বাজার থেকে সংগ্রহ করা মাছ লবণ মিশিয়ে সিমেন্টের চাড়িতে ৮–৯ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখা হয়। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ শুকানোর পালা।

সরকারি হিসাব বলছে, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে তাড়াশ, উল্লাপাড়া, চাটমোহর ও গুরুদাসপুর উপজেলায় মিলিয়ে হাজার টনের বেশি শুঁটকি উৎপাদন হয়েছে। ২০২৫ সালে অক্টোবর পর্যন্ত অর্ধশতাধিক চাতালে উৎপাদন শুরু হয়েছে, যেখানে কাজ করছেন ৪৫০ থেকে ৫০০ জন নারী-পুরুষ শ্রমিক। পুরুষ শ্রমিকরা দৈনিক ৫০০–৬০০ টাকা এবং নারী শ্রমিকরা ২৫০–৩০০ টাকা মজুরি পান, সঙ্গে একবেলার খাবার ও যাতায়াত খরচ।

বর্তমানে পুঁটি শুঁটকি মণপ্রতি ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকা, বোয়াল ৮০ থেকে ৯৫ হাজার, টাকি ৫৫ থেকে ৬০ হাজার, খলিশা ১৫ থেকে ১৬ হাজার, গুচি ৪০ থেকে ৪৫ হাজার এবং ইছা ২৮ থেকে ৩২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে এই লাভের আড়ালে রয়েছে বড় ঝুঁকি। দশ বছর আগে যেখানে একটি চাতাল বসাতে ৫–৬ লাখ টাকা লাগত, এখন সেখানে প্রয়োজন হয় ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা পুঁজি। ভালো মৌসুমে লাভ হয় ৪–৫ লাখ টাকা, আবার বৃষ্টি বা রোদ কম হলে পচে গিয়ে লোকসানও হয়।

চলনবিলের শুঁটকি এখন আর শুধু স্থানীয় বাজারে সীমাবদ্ধ নয়। আড়তদারদের হাত ধরে এটি পৌঁছে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, এমনকি পাড়ি দিচ্ছে প্রতিবেশী দেশ ভারতেও। সেখানে ক্রমেই বাড়ছে চলনবিলের শুঁটকির কদর।

তাড়াশ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মোকারম আলী বলেন, শুঁটকির চাতাল শুধু মানুষের জীবিকা নিশ্চিত করছে না, স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতিতেও রাখছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।”

রোদে শুকানো মাছের গন্ধে, শ্রমে আর ঘামে গড়া এই শিল্প তাই শুধু ব্যবসা নয়—চলনবিলের মানুষের বেঁচে থাকার এক অনিবার্য গল্প।

জনপ্রিয় খবর
blank

বিএনপি-জামায়াতের সংঘর্ষে ইউনিয়ন আমীরসহ আহত ১০॥ ১২টি বাড়ি-দোকান ভাংচুর ॥ আটক চার

শুঁটকির ঘ্রাণে ভেসে থাকা জীবন: চলনবিলের কর্মযজ্ঞ

প্রকাশের সময় : ০৭:৫৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬
blank

চলনবিলে বর্ষা মানেই শুধু জল আর ঢেউ নয়—বর্ষার সঙ্গে ভেসে আসে জীবনের সম্ভাবনাও। বিলে ছলছল করে ওঠে দেশীয় ছোট-বড় মাছ। সেই মাছ ঘিরেই বছরের একটি নির্দিষ্ট সময় জীবনের হিসাব মেলান বিলপাড়ের মানুষজন। আশ্বিন থেকে মাঘ—এই সময়টুকুতে যেন নতুন করে জেগে ওঠে চলনবিলসংলগ্ন শুঁটকির চাতালগুলো। প্রখর রোদের নিচে মাছ শুকানোর দৃশ্য একদিকে যেমন শ্রমের, অন্যদিকে তেমনি টিকে থাকার এক অনন্য গল্প।

চাটমোহর, তাড়াশ, উল্লাপাড়া, গুরুদাসপুর—চলনবিলের এই জনপদগুলোতে শুঁটকি শুধু খাদ্য নয়, এটি জীবিকার ভাষা। প্রায় ৭০ থেকে ৮৫ জন মৎস্যজীবী-ব্যবসায়ী বছরের এই সময়ে দেশীয় নানা প্রজাতির মাছ দিয়ে তৈরি করেন স্বাস্থ্যসম্মত শুঁটকি। তাদের হাতে গড়া এই শিল্প আজ বহু পরিবারকে দাঁড় করিয়েছে নিজের পায়ে। রোদে শুকানো মাছের মতোই ধীরে ধীরে পুষ্ট হয় সংসার, পূরণ হয় সন্তানের পড়াশোনা আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন।

পাবনার চাটমোহরের হান্ডিয়াল পূর্বপাড়ায় গেলে এখনো দেখা মেলে এক জীবন্ত ইতিহাসের—পলান প্রামাণিক। ছয় দশকের বেশি সময় ধরে তিনি আগলে রেখেছেন চলনবিলের শুঁটকি তৈরির ঐতিহ্য। যৌবনে নীলফামারীর সৈয়দপুরে এক শুঁটকি ব্যবসায়ীর কাছ থেকে শেখা কৌশলই বদলে দেয় তাঁর জীবনের গতিপথ।

একসময় অতিরিক্ত মাছের জোগানে বাজারে মাছ নষ্ট হয়ে যেত। সেই সংকট থেকেই জন্ম নেয় নতুন ভাবনা—সস্তায় মাছ কিনে রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করা। প্রথম বছরেই লাভ আসে। তারপর আর থামেনি পথচলা। বড় হয়েছে চাতাল, বদলেছে সংসারের চেহারা। আজ বাবার পথ ধরেই তিন দশকের বেশি সময় ধরে শুঁটকির পেশায় যুক্ত ছেলে মোফাজ্জল হোসেন প্রামাণিকও।

আষাঢ়ে আকাশে মেঘ জমতেই শুরু হয় প্রস্তুতি। বাঁশের বানা, খুঁটি, মাছঘর, ডালা, হাতা, টুপড়ি—সব গুছিয়ে নেওয়া হয় যত্নে। ভাদ্রের মাঝামাঝি অপেক্ষাকৃত উঁচু জায়গায় বসে শুঁটকির চাতাল। বাজারে যখন পুঁটি, ট্যাংরা, টাকি, বোয়াল, শোল, খলিশা, চান্দা, গুচি কিংবা ইছা মাছের জোয়ার নামে, তখনই শুরু হয় শুঁটকি তৈরির আসল কর্মযজ্ঞ।

বিলের কাদা ঠেলে দলে দলে নারী-পুরুষ শ্রমিক আসেন চাতালে। কারও হাতে ছুরি-বঁটি, কেউ লবণ মেশান, কেউ কাঠের হাতায় মাছ উল্টে দেন—যাতে রোদে সমানভাবে শুকায়। একটি মাঝারি চাতালে মৌসুমে তৈরি হয় ৩০০ থেকে ৩৫০ মণ শুঁটকি। প্রায় চার কেজি মাছ শুকিয়ে পাওয়া যায় এক কেজি শুঁটকি। রোদে পাততে পাততে দিনের পর দিন ধরে তৈরি হয় সেই সুগন্ধি দেশীয় শুঁটকি।

মহিষলুটি, খলিশাগাড়ী, বিলসা, সলঙ্গা, চারঘাট, সিংড়া এলাকার বাজার থেকে সংগ্রহ করা মাছ লবণ মিশিয়ে সিমেন্টের চাড়িতে ৮–৯ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখা হয়। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ শুকানোর পালা।

সরকারি হিসাব বলছে, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে তাড়াশ, উল্লাপাড়া, চাটমোহর ও গুরুদাসপুর উপজেলায় মিলিয়ে হাজার টনের বেশি শুঁটকি উৎপাদন হয়েছে। ২০২৫ সালে অক্টোবর পর্যন্ত অর্ধশতাধিক চাতালে উৎপাদন শুরু হয়েছে, যেখানে কাজ করছেন ৪৫০ থেকে ৫০০ জন নারী-পুরুষ শ্রমিক। পুরুষ শ্রমিকরা দৈনিক ৫০০–৬০০ টাকা এবং নারী শ্রমিকরা ২৫০–৩০০ টাকা মজুরি পান, সঙ্গে একবেলার খাবার ও যাতায়াত খরচ।

বর্তমানে পুঁটি শুঁটকি মণপ্রতি ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকা, বোয়াল ৮০ থেকে ৯৫ হাজার, টাকি ৫৫ থেকে ৬০ হাজার, খলিশা ১৫ থেকে ১৬ হাজার, গুচি ৪০ থেকে ৪৫ হাজার এবং ইছা ২৮ থেকে ৩২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে এই লাভের আড়ালে রয়েছে বড় ঝুঁকি। দশ বছর আগে যেখানে একটি চাতাল বসাতে ৫–৬ লাখ টাকা লাগত, এখন সেখানে প্রয়োজন হয় ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা পুঁজি। ভালো মৌসুমে লাভ হয় ৪–৫ লাখ টাকা, আবার বৃষ্টি বা রোদ কম হলে পচে গিয়ে লোকসানও হয়।

চলনবিলের শুঁটকি এখন আর শুধু স্থানীয় বাজারে সীমাবদ্ধ নয়। আড়তদারদের হাত ধরে এটি পৌঁছে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, এমনকি পাড়ি দিচ্ছে প্রতিবেশী দেশ ভারতেও। সেখানে ক্রমেই বাড়ছে চলনবিলের শুঁটকির কদর।

তাড়াশ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মোকারম আলী বলেন, শুঁটকির চাতাল শুধু মানুষের জীবিকা নিশ্চিত করছে না, স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতিতেও রাখছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।”

রোদে শুকানো মাছের গন্ধে, শ্রমে আর ঘামে গড়া এই শিল্প তাই শুধু ব্যবসা নয়—চলনবিলের মানুষের বেঁচে থাকার এক অনিবার্য গল্প।