দেশের উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহত্তম প্রাকৃতিক জলাভূমি চলনবিলে মধু সংগ্রহকে কেন্দ্র করে বাড়ছে সরিষা চাষ। নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে অবস্থিত এই চলনবিলে চলতি মৌসুমে ব্যাপকভাবে সরিষার আবাদ হয়েছে। হলুদ ফুলে ছেয়ে যাওয়া মাঠে মৌমাছির গুঞ্জনে মুখরিত হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা, আর সরিষা ক্ষেতের পাশে সারি সারি মৌবাক্স বসিয়ে মধু সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করছেন মৌচাষী ও কৃষকরা।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর চলনবিলে প্রায় ৪ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ করা হয়েছে। সরিষা ক্ষেতকে কেন্দ্র করে প্রাকৃতিকভাবে মধু উৎপাদন হওয়ায় কৃষকরা ফসলের পাশাপাশি বাড়তি আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন সরিষার আবাদ বাড়ছে, অন্যদিকে তেমনি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে মধুচাষ।
সরেজমিনে দেখা যায়, চলনবিলের তাড়াশ, চাটমোহর, গুরুদাসপুর, বড়াইগ্রাম ও সিংড়া উপজেলার ডাহিয়া, চামারী, হাতিয়ান্দহ, লালোর, শেরকোল, চৌগ্রাম ও পৌর এলাকার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে শুধুই হলুদ ফুলের সমারোহ। এসব সরিষা ক্ষেতের পাশে মৌবাক্স স্থাপন করে মৌয়ালরা সংগ্রহ করছেন বিশুদ্ধ প্রাকৃতিক মধু।
গুরুদাসপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস জানায়, এ বছর উপজেলায় ১ হাজার ১১৫ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে। সরিষা ক্ষেত সংলগ্ন প্রায় ৩৫০ হেক্টর এলাকায় ৬৮০টি মৌবাক্স বসানো হয়েছে। মৌসুম শেষে এসব বাক্স থেকে প্রায় ৬ হাজার ৩৭৫ মেট্রিক টন মধু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তাড়াশ উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ১১ হাজার ৮০৫ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের সরিষা আবাদ হয়েছে। কৃষি কর্মকর্তারা জানান, সরিষা ক্ষেতের পাশে মৌচাষ করলে পরাগায়নের কারণে সরিষার ফলন প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।
চলনবিলের অভিজ্ঞ মৌচাষী আব্দুল মজিদ বলেন, “আমি সাতক্ষীরা থেকে এখানে মধু সংগ্রহ করতে আসি। গত দশ বছর ধরে চলনবিলে মধু সংগ্রহ করছি। আমার ১৩০টি বাক্স আছে, দুই সপ্তাহে ৭ থেকে ৮ মণ মধু পাওয়া যায়। প্রতি কেজি মধু ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা দরে বিক্রি করছি।”
সিংড়া উপজেলার মৌচাষী নাসির আলী জানান, কৃষি অফিসের সহযোগিতায় প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি মধুচাষ শুরু করেছেন। তার ১৮০টি মৌবাক্স থেকে সপ্তাহে প্রায় ২০০ কেজি মধু সংগ্রহ করা যায়। একই উপজেলার মৌচাষী দুই সহোদর সাগর ও আলমগীর জানান, মধুচাষ খুবই লাভজনক হওয়ায় তারা এ বছর ২ থেকে ৩ লাখ টাকার মধু বিক্রির আশা করছেন।
সিংড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, “সরিষা থেকে মধু উৎপাদনের সুযোগ থাকায় চলনবিলে সরিষা চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। আমরা মৌচাষীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি এবং প্রণোদনা হিসেবে মৌবাক্স সরবরাহ করছি। ভবিষ্যতে সরিষা চাষের পাশাপাশি মধুচাষির সংখ্যাও আরও বাড়বে বলে আশা করছি।”
মোটকথা, সরিষা ও মধুচাষের সমন্বয়ে চলনবিলে গড়ে উঠছে লাভজনক কৃষি উদ্যোগ। এতে কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থাও শক্তিশালী হচ্ছে।

বিশেষ প্রতিনিধি 



















