ভোরের নীরবতা ছিন্ন করে উঠে এলো তরুণদের ন্যায়ের আহ্বান। ইনস্টিটিউট অব লাইভস্টক সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (ILST) শত শত ছাত্র-ছাত্রী আজ সোমবার (১০ নভেম্বর) সকালে হঠাৎ করে সরাইল–নাসিরনগর–লাখাই আঞ্চলিক সড়কে নেমে আসে।
হাতে প্ল্যাকার্ড, মুখে আবেগ, গলায় তেজি স্লোগান – “যোগ্যতার মূল্য দাও”, “ডিপ্লোমা ডিগ্রিকে স্বীকৃতি দাও”, “আমরা পশুর ডাক্তার, অবহেলার নয় শিকার!”
সকালের শান্ত মানচিত্র মুহূর্তেই বদলে যায়। ঢেউয়ের মতো ছড়িয়ে পড়া এই আন্দোলনে পুরো সড়ক অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে – থেমে যায় বাস, ট্রাক, সিএনজি, মোটরসাইকেল।
ILST ক্যাম্পাস থেকে মিছিলটি উপজেলা সদর অতিক্রম করে এসে প্রধান সড়কে অবস্থান নেয়। তাদের দাবি স্পষ্ট – সরকারি নতুন নিয়োগবিধিতে ডিপ্লোমা ইন লাইভস্টক সায়েন্স ডিগ্রিধারীদের জন্য নির্দিষ্ট পদ সংরক্ষণ করতে হবে। তাদের যুক্তি যুক্তিপূর্ণ – চার বছরব্যাপী কঠোর প্রশিক্ষণ, মাঠপর্যায়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও বৈজ্ঞানিক দক্ষতা নিয়েও তারা সরকারি চাকরির তালিকায় স্থান পাচ্ছেন না।
এক শিক্ষার্থী মাইকে বলল, “আমরা ভ্যাকসিন তৈরি জানি, ফিড ফর্মুলেশন জানি, পশুর রোগ নির্ণয় করি। অথচ আমাদের বাদ দিয়ে অপ্রশিক্ষিতদের পদ দেওয়া হচ্ছে! এটা অন্যায়, এটা বৈষম্য।”
অন্যজনের কণ্ঠে ক্ষোভ, “আমরা শুধু চাকরি চাই না, সম্মান চাই। আমাদের পড়াশোনা যদি মূল্যহীন হয়, তাহলে এত বছর পরিশ্রম করার মানে কী?”
প্রতিবাদের পেছনে আছে বাস্তব সংকট। সারাদেশে সরকারি-বেসরকারি মিলে বর্তমানে ১৮টি লাইভস্টক ইনস্টিটিউট রয়েছে। প্রতিবছর দুই হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ডিপ্লোমা শেষ করে বের হয়, কিন্তু তাদের জন্য সরকারি কোনো স্পষ্ট নিয়োগ কাঠামো নেই। প্রাণিসম্পদ খাত দেশের কৃষি ও অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ হলেও, এই খাতে প্রশিক্ষিত জনবল অবহেলার শিকার – এই বঞ্চনাই আন্দোলনের মূলে।
স্থানীয়রা জানান, শিক্ষার্থীরা শুরুতে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান নিলেও প্রশাসনের প্রতিনিধি দেরিতে পৌঁছালে উত্তেজনা কিছুটা বাড়ে। পরে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাহেল আহমেদ ও থানা অফিসার ইনচার্জ মকছুদ আহমেদ ঘটনাস্থলে এসে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে “দাবিগুলো মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে” – এমন আশ্বাস পেলে শিক্ষার্থীরা অবরোধ তুলে নেয়।
তবে অবরোধ তুললেও ক্ষোভ থামেনি। এক শিক্ষার্থী বলল, “আজ আমরা সড়ক খুলে দিলাম, কিন্তু আমাদের কণ্ঠ চুপ থাকবে না। যদি প্রাপ্য সম্মান না মেলে, তাহলে কাল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রতিটি উপজেলা জেগে উঠবে।”
নাসিরনগরের স্থানীয় শিক্ষক আমিনুল ইসলাম বলেন, “এরা আমাদের গ্রামের ছেলেমেয়ে। ভোরে উঠে মাঠে পশুর যত্ন নেয়, গবেষণাগারে কাজ করে, নতুন প্রযুক্তি শেখে। অথচ এই জ্ঞান আজ অবহেলার শিকার। তাদের কণ্ঠরোধ করা মানে দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ ধ্বংস করা।”
প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, “শিক্ষার্থীদের দাবি যৌক্তিক। আমরা বিষয়টি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। এখন সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করছি।”

জহির শাহ্, ব্রাহ্মণবাড়িয়া 




















