ঢাকা সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২৬, ২৪ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি হবেন বিরোধী দল থেকে

  • অনলাইন ডেস্ক
  • প্রকাশের সময় : ০৩:৩৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • 39
blank

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত গণভোটে বিপুল ব্যবধানে ‘হ্যাঁ’ ভোটের জয় হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দেশের শাসনব্যবস্থায় বড় ধরনের কাঠামোগত ও সাংবিধানিক পরিবর্তনের পথ খুলে গেল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই রায়ের মাধ্যমে জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি নিশ্চিত হলো এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি ও ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার একটি নতুন অধ্যায় শুরু হচ্ছে বাংলাদেশে।

গণভোটের ফল অনুযায়ী জাতীয় সংসদ হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। সংসদের উচ্চকক্ষ গঠিত হবে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে ১০০ সদস্য নিয়ে। সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন বাধ্যতামূলক থাকবে। পাশাপাশি ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতিদের নিয়োগ দেওয়া হবে বিরোধী দল থেকে—যা সংসদীয় গণতন্ত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সংসদের নতুন ভূমিকা

নির্বাচিত সংসদ প্রথম ১৮০ দিন সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। এই সময় শেষে সংসদ নিয়মিত আইনপ্রণেতা হিসেবে কাজ শুরু করবে। জুলাই সনদ অনুযায়ী নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ একাধিক সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন বা নতুনভাবে গঠন করা হবে।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের সিদ্ধান্তও এসেছে গণভোটে। নতুন বিধান অনুযায়ী অর্থবিল ও সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব ছাড়া অন্য সব বিলে সংসদ-সদস্যরা দলীয় সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ভোট দিতে পারবেন।

মৌলিক নীতি ও অধিকার

জুলাই সনদে সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতির কথা বলা হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার স্থলে যুক্ত হচ্ছে সব সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ও যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার। মৌলিক অধিকারের তালিকায় যুক্ত হচ্ছে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট ব্যবহারের অধিকার ও ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার বিষয়টি।

নারীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে সংরক্ষিত আসন ৫০ থেকে ধাপে ধাপে ১০০-তে উন্নীত করার প্রস্তাবও অনুমোদিত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ও জরুরি অবস্থা

নতুন ব্যবস্থায় একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন। জরুরি অবস্থা জারির ক্ষেত্রে একক ক্ষমতার পরিবর্তে মন্ত্রিসভার অনুমোদন লাগবে এবং সে বৈঠকে বিরোধীদলীয় নেতা ও উপনেতার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক হবে। জরুরি অবস্থার সময়ও সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মৌলিক অধিকার খর্ব করা যাবে না।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও অভিশংসন

রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের সদস্যদের গোপন ব্যালটের ভোটে। রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসনের ক্ষেত্রেও উভয় কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের বিধান যুক্ত হয়েছে। অপরাধীকে ক্ষমা করার ক্ষেত্রেও নতুন শর্ত যুক্ত করা হয়েছে—ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা পরিবারের সম্মতি ছাড়া রাষ্ট্রপতি ক্ষমা দিতে পারবেন না।

বিচার বিভাগ ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান

প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দিতে হবে আপিল বিভাগ থেকে। বিচারক নিয়োগে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন কমিশনের ভূমিকা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিচার বিভাগকে পূর্ণ স্বাধীনতার সাংবিধানিক নিশ্চয়তা, প্রতিটি বিভাগে হাইকোর্ট বেঞ্চ স্থাপন এবং সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে শক্তিশালী করার সিদ্ধান্তও এসেছে সনদে।

গণভোটের ফলাফল

এবারের গণভোটে মোট ভোটার ছিলেন ১২ কোটি ৭৭ লাখ। ভোট পড়েছে ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ। ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ জন, আর ‘না’ ভোট দিয়েছেন ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ জন। বিশাল ব্যবধানে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশের ইতিহাসে এটি চতুর্থ গণভোট। ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী না হলে জুলাই সনদ ও এর বাস্তবায়ন আদেশের কোনো আইনি ভিত্তি থাকত না। তাই এই গণভোটকে সরকারের জন্য সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং ও তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

জনপ্রিয় খবর
blank

নলডাঙ্গাকে ‘মডেল পৌরসভা’ গড়ার প্রত্যয় মেয়র প্রার্থী এ্যাড. জাহিদের

ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি হবেন বিরোধী দল থেকে

প্রকাশের সময় : ০৩:৩৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
blank

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত গণভোটে বিপুল ব্যবধানে ‘হ্যাঁ’ ভোটের জয় হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দেশের শাসনব্যবস্থায় বড় ধরনের কাঠামোগত ও সাংবিধানিক পরিবর্তনের পথ খুলে গেল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই রায়ের মাধ্যমে জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি নিশ্চিত হলো এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি ও ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার একটি নতুন অধ্যায় শুরু হচ্ছে বাংলাদেশে।

গণভোটের ফল অনুযায়ী জাতীয় সংসদ হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। সংসদের উচ্চকক্ষ গঠিত হবে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে ১০০ সদস্য নিয়ে। সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন বাধ্যতামূলক থাকবে। পাশাপাশি ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতিদের নিয়োগ দেওয়া হবে বিরোধী দল থেকে—যা সংসদীয় গণতন্ত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সংসদের নতুন ভূমিকা

নির্বাচিত সংসদ প্রথম ১৮০ দিন সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। এই সময় শেষে সংসদ নিয়মিত আইনপ্রণেতা হিসেবে কাজ শুরু করবে। জুলাই সনদ অনুযায়ী নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ একাধিক সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন বা নতুনভাবে গঠন করা হবে।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের সিদ্ধান্তও এসেছে গণভোটে। নতুন বিধান অনুযায়ী অর্থবিল ও সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব ছাড়া অন্য সব বিলে সংসদ-সদস্যরা দলীয় সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ভোট দিতে পারবেন।

মৌলিক নীতি ও অধিকার

জুলাই সনদে সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতির কথা বলা হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার স্থলে যুক্ত হচ্ছে সব সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ও যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার। মৌলিক অধিকারের তালিকায় যুক্ত হচ্ছে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট ব্যবহারের অধিকার ও ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার বিষয়টি।

নারীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে সংরক্ষিত আসন ৫০ থেকে ধাপে ধাপে ১০০-তে উন্নীত করার প্রস্তাবও অনুমোদিত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ও জরুরি অবস্থা

নতুন ব্যবস্থায় একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন। জরুরি অবস্থা জারির ক্ষেত্রে একক ক্ষমতার পরিবর্তে মন্ত্রিসভার অনুমোদন লাগবে এবং সে বৈঠকে বিরোধীদলীয় নেতা ও উপনেতার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক হবে। জরুরি অবস্থার সময়ও সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মৌলিক অধিকার খর্ব করা যাবে না।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও অভিশংসন

রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের সদস্যদের গোপন ব্যালটের ভোটে। রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসনের ক্ষেত্রেও উভয় কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের বিধান যুক্ত হয়েছে। অপরাধীকে ক্ষমা করার ক্ষেত্রেও নতুন শর্ত যুক্ত করা হয়েছে—ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা পরিবারের সম্মতি ছাড়া রাষ্ট্রপতি ক্ষমা দিতে পারবেন না।

বিচার বিভাগ ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান

প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দিতে হবে আপিল বিভাগ থেকে। বিচারক নিয়োগে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন কমিশনের ভূমিকা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিচার বিভাগকে পূর্ণ স্বাধীনতার সাংবিধানিক নিশ্চয়তা, প্রতিটি বিভাগে হাইকোর্ট বেঞ্চ স্থাপন এবং সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে শক্তিশালী করার সিদ্ধান্তও এসেছে সনদে।

গণভোটের ফলাফল

এবারের গণভোটে মোট ভোটার ছিলেন ১২ কোটি ৭৭ লাখ। ভোট পড়েছে ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ। ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ জন, আর ‘না’ ভোট দিয়েছেন ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ জন। বিশাল ব্যবধানে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশের ইতিহাসে এটি চতুর্থ গণভোট। ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী না হলে জুলাই সনদ ও এর বাস্তবায়ন আদেশের কোনো আইনি ভিত্তি থাকত না। তাই এই গণভোটকে সরকারের জন্য সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং ও তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।