ঢাকা শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬, ২৯ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

চুয়াডাঙ্গার আবাসন প্রকল্পে চলছে লুণ্ঠন

blank

‘মুজিব শতবর্ষ’ উপলক্ষে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া ভূমিহীন ও গৃহহীনদের জন্য নির্মিত আবাসন প্রকল্পগুলো চুয়াডাঙ্গায় এখন গুরুতর অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার শিকার। সরকারের মহৎ উদ্যোগ ভেস্তে দিয়ে অনেক সচ্ছল ব্যক্তি রাজনৈতিক বিবেচনায় ঘর বাগিয়ে নিয়ে তা বিক্রি করে দিয়েছেন অথবা ভাড়া দিয়ে নিজেদের লাভ তুলে নিচ্ছেন। 

 

অন্যদিকে, নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী, অপরিষ্কার পরিবেশ এবং প্রভাবশালী প্রতিবেশীদের অত্যাচারে প্রকৃত ভূমিহীন বাসিন্দারা মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

 

জেলা প্রশাসনের তথ্য মতে, মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে চুয়াডাঙ্গায় চার ধাপে অসহায় ভূমিহীন ও গৃহহীনদের মাঝে মোট ৬৯৫টি বাড়ি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ১৭৫, আলমডাঙ্গায় ১৭৫, দামুড়হুদায় ১২৩, জীবননগরে ১৫৩টিসহ মোট ৬৯৫টি বাড়ি রয়েছে। তবে দামুড়হুদার হাউলী ইউনিয়নের দর্শনা রেলগেট আবাসন এবং সদর উপজেলার ৬২ আড়িয়া গ্রামের আশ্রয়ণ সরেজমিনে পরিদর্শন করে চরম হতাশার চিত্র পাওয়া গেছে।

 

সরকারি নীতিমালায় স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও আবাসন প্রকল্পের ঘরগুলো বিক্রি ও ভাড়া দেওয়ার একাধিক প্রমাণ মিলেছে। এই বেআইনি কর্মকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো সচ্ছল সুবিধাভোগীদের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

৬২ আড়িয়া গ্রামের চিত্র: সদর উপজেলার ৬২ আড়িয়া গ্রামের আশ্রয়ণে মোট ২০টি ঘরের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ১২টি পরিবার বাস করছে। বাকি ৮টি ঘরের বাসিন্দারা সেখানে থাকেন না।

বিক্রির অভিযোগ: স্থানীয়দের অভিযোগ, সচ্ছল ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক বিবেচনায় ঘর পাওয়া ছমির হোসেন তার ঘর ১৮ হাজার টাকায় এবং খবির উদ্দিন তার ঘর ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করে নিজেদের বাড়িতে ফিরে গেছেন।

আরও যারা চলে গেছেন: আবাসনের প্রবীণ বাসিন্দা খলিল মিয়া জানান, সেন্টু, সফুরা, ছানোয়ার হোসেন, আলী বাক্স, মহিদুল ইসলাম, সালাম, খাদেজা ও জামালও ঘর বিক্রি করে অনেক আগেই চলে গেছেন।

ভাড়ায় দেওয়া: অনেক ঘর এখন তালাবদ্ধ, আবার কোনো কোনো ঘর ভাড়ায় দেওয়া হয়েছে। বাসিন্দা দোলন নেছা জানান, জহির উদ্দিন ঘর ভাড়ায় দিয়ে চলে গেছেন। বর্তমানে সেই ঘরে থাকা রূপালী নামের এক নারী জানান, ঘরমালিক প্রতি মাসে ৪০০ টাকা করে ভাড়া চাচ্ছেন, অন্যথায় ১২ হাজার টাকায় বাড়িটি কিনে নিতে চাপ দিচ্ছেন। ঘর নির্মাণের শুরু থেকেই নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছেন বাসিন্দারা, যার ফলস্বরূপ ঘরগুলো দ্রুতই বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে।

মেঝেতে বালু নেই: দামুড়হুদার হাউলী ইউনিয়নের দর্শনা রেলগেট আবাসনের বাসিন্দা ও পার্শ্ববর্তী পরানপুর গ্রামের ইউনুস অভিযোগ করেন, ঘর তৈরির সময় মেঝেতে বালুর বদলে মাটি দেওয়া হয়েছিল।

ভেঙে পড়ছে মেঝে: অধিকাংশ বাসিন্দার অভিযোগ— মেঝেতে কোনো খোয়া বা ইট ব্যবহার করা হয়নি। কেবল বালুর ওপর সিমেন্টের হালকা প্রলেপ দেওয়ায় অল্প দিনেই মেঝের বালি বেরিয়ে মাটি দেখা যাচ্ছে।

দেয়ালে ফাটল: ৬২ আড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা হালিমা খাতুন জানান, নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রীর কারণে দেয়ালে ফাটল ধরেছে, যা সামান্য ঠেলাতেই ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

অকেজো বাথরুম: বাথরুমগুলোর ট্যাঙ্কিতে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় কয়েক মাসের মধ্যেই সেগুলো ভরাট হয়ে গেছে এবং বর্তমানে ব্যবহারের অনুপযোগী। নিম্নমানের ঘরের পাশাপাশি আশ্রয়ণের বাসিন্দারা মৌলিক সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন এবং এলাকার প্রভাবশালী মহলের অত্যাচারের শিকার হচ্ছেন।

তীব্র পানির সংকট: দামুড়হুদার হাউলী ইউনিয়নের দর্শনা রেলগেট আবাসনে ৬২টি পরিবারের জন্য মাত্র দুটি টিউবওয়েল দেওয়া হয়েছিল, যা অনেক আগেই নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে তারা খাবার পানি সংগ্রহে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।

জমির মালিকদের অত্যাচার: ৬২ আড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা হাজেরা খাতুন অভিযোগ করেন, তাদের ঘরের পেছনে বৃক্ষরোপণের জন্য নির্ধারিত জায়গা পাশের জমির মালিকরা জোরপূর্বক দখল করে নিয়েছেন। প্রতিবাদ জানালে তারা আশ্রয়ণের ঘর ভেঙে দেওয়ার ভয় দেখাচ্ছেন।

 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী অফিসার তিথি মিত্র বলেন, “এসব ঘরে এখন কারা কিভাবে থাকেন, সেই তথ্য আমাদের কাছে নেই। যেহেতু অভিযোগের বিষয়ে জানলাম, সরেজমিনে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার এম. সাইফুল্লাহ বলেন, “অনিয়মের বিষয়গুলো আমার জানা ছিল না। ৬২ আড়িয়া আবাসনের খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।”

চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম কঠোরভাবে বলেন, “সরকারি ঘর কেউ ভাড়ায় দিতে পারে না, বিক্রিও করতে পারে না। বিষয়টি আমার কাছে কেউ বিস্তারিত জানালে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

 

এলাকার সচেতন মহলের দাবি, সরকারি ঘর বিক্রির সঙ্গে জড়িত সচ্ছল ব্যক্তি এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো চক্রকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক এবং নিম্নমানের কাজের সাথে জড়িত ঠিকাদার ও কর্মকর্তাদের তদন্ত করে আইনের আওতায় আনা হোক।

blank

আওয়ামী লীগকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বললেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন

চুয়াডাঙ্গার আবাসন প্রকল্পে চলছে লুণ্ঠন

প্রকাশের সময় : ১২:৫১ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩ নভেম্বর ২০২৫
blank

‘মুজিব শতবর্ষ’ উপলক্ষে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া ভূমিহীন ও গৃহহীনদের জন্য নির্মিত আবাসন প্রকল্পগুলো চুয়াডাঙ্গায় এখন গুরুতর অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার শিকার। সরকারের মহৎ উদ্যোগ ভেস্তে দিয়ে অনেক সচ্ছল ব্যক্তি রাজনৈতিক বিবেচনায় ঘর বাগিয়ে নিয়ে তা বিক্রি করে দিয়েছেন অথবা ভাড়া দিয়ে নিজেদের লাভ তুলে নিচ্ছেন। 

 

অন্যদিকে, নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী, অপরিষ্কার পরিবেশ এবং প্রভাবশালী প্রতিবেশীদের অত্যাচারে প্রকৃত ভূমিহীন বাসিন্দারা মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

 

জেলা প্রশাসনের তথ্য মতে, মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে চুয়াডাঙ্গায় চার ধাপে অসহায় ভূমিহীন ও গৃহহীনদের মাঝে মোট ৬৯৫টি বাড়ি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ১৭৫, আলমডাঙ্গায় ১৭৫, দামুড়হুদায় ১২৩, জীবননগরে ১৫৩টিসহ মোট ৬৯৫টি বাড়ি রয়েছে। তবে দামুড়হুদার হাউলী ইউনিয়নের দর্শনা রেলগেট আবাসন এবং সদর উপজেলার ৬২ আড়িয়া গ্রামের আশ্রয়ণ সরেজমিনে পরিদর্শন করে চরম হতাশার চিত্র পাওয়া গেছে।

 

সরকারি নীতিমালায় স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও আবাসন প্রকল্পের ঘরগুলো বিক্রি ও ভাড়া দেওয়ার একাধিক প্রমাণ মিলেছে। এই বেআইনি কর্মকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো সচ্ছল সুবিধাভোগীদের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

৬২ আড়িয়া গ্রামের চিত্র: সদর উপজেলার ৬২ আড়িয়া গ্রামের আশ্রয়ণে মোট ২০টি ঘরের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ১২টি পরিবার বাস করছে। বাকি ৮টি ঘরের বাসিন্দারা সেখানে থাকেন না।

বিক্রির অভিযোগ: স্থানীয়দের অভিযোগ, সচ্ছল ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক বিবেচনায় ঘর পাওয়া ছমির হোসেন তার ঘর ১৮ হাজার টাকায় এবং খবির উদ্দিন তার ঘর ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করে নিজেদের বাড়িতে ফিরে গেছেন।

আরও যারা চলে গেছেন: আবাসনের প্রবীণ বাসিন্দা খলিল মিয়া জানান, সেন্টু, সফুরা, ছানোয়ার হোসেন, আলী বাক্স, মহিদুল ইসলাম, সালাম, খাদেজা ও জামালও ঘর বিক্রি করে অনেক আগেই চলে গেছেন।

ভাড়ায় দেওয়া: অনেক ঘর এখন তালাবদ্ধ, আবার কোনো কোনো ঘর ভাড়ায় দেওয়া হয়েছে। বাসিন্দা দোলন নেছা জানান, জহির উদ্দিন ঘর ভাড়ায় দিয়ে চলে গেছেন। বর্তমানে সেই ঘরে থাকা রূপালী নামের এক নারী জানান, ঘরমালিক প্রতি মাসে ৪০০ টাকা করে ভাড়া চাচ্ছেন, অন্যথায় ১২ হাজার টাকায় বাড়িটি কিনে নিতে চাপ দিচ্ছেন। ঘর নির্মাণের শুরু থেকেই নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছেন বাসিন্দারা, যার ফলস্বরূপ ঘরগুলো দ্রুতই বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে।

মেঝেতে বালু নেই: দামুড়হুদার হাউলী ইউনিয়নের দর্শনা রেলগেট আবাসনের বাসিন্দা ও পার্শ্ববর্তী পরানপুর গ্রামের ইউনুস অভিযোগ করেন, ঘর তৈরির সময় মেঝেতে বালুর বদলে মাটি দেওয়া হয়েছিল।

ভেঙে পড়ছে মেঝে: অধিকাংশ বাসিন্দার অভিযোগ— মেঝেতে কোনো খোয়া বা ইট ব্যবহার করা হয়নি। কেবল বালুর ওপর সিমেন্টের হালকা প্রলেপ দেওয়ায় অল্প দিনেই মেঝের বালি বেরিয়ে মাটি দেখা যাচ্ছে।

দেয়ালে ফাটল: ৬২ আড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা হালিমা খাতুন জানান, নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রীর কারণে দেয়ালে ফাটল ধরেছে, যা সামান্য ঠেলাতেই ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

অকেজো বাথরুম: বাথরুমগুলোর ট্যাঙ্কিতে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় কয়েক মাসের মধ্যেই সেগুলো ভরাট হয়ে গেছে এবং বর্তমানে ব্যবহারের অনুপযোগী। নিম্নমানের ঘরের পাশাপাশি আশ্রয়ণের বাসিন্দারা মৌলিক সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন এবং এলাকার প্রভাবশালী মহলের অত্যাচারের শিকার হচ্ছেন।

তীব্র পানির সংকট: দামুড়হুদার হাউলী ইউনিয়নের দর্শনা রেলগেট আবাসনে ৬২টি পরিবারের জন্য মাত্র দুটি টিউবওয়েল দেওয়া হয়েছিল, যা অনেক আগেই নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে তারা খাবার পানি সংগ্রহে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।

জমির মালিকদের অত্যাচার: ৬২ আড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা হাজেরা খাতুন অভিযোগ করেন, তাদের ঘরের পেছনে বৃক্ষরোপণের জন্য নির্ধারিত জায়গা পাশের জমির মালিকরা জোরপূর্বক দখল করে নিয়েছেন। প্রতিবাদ জানালে তারা আশ্রয়ণের ঘর ভেঙে দেওয়ার ভয় দেখাচ্ছেন।

 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী অফিসার তিথি মিত্র বলেন, “এসব ঘরে এখন কারা কিভাবে থাকেন, সেই তথ্য আমাদের কাছে নেই। যেহেতু অভিযোগের বিষয়ে জানলাম, সরেজমিনে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার এম. সাইফুল্লাহ বলেন, “অনিয়মের বিষয়গুলো আমার জানা ছিল না। ৬২ আড়িয়া আবাসনের খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।”

চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম কঠোরভাবে বলেন, “সরকারি ঘর কেউ ভাড়ায় দিতে পারে না, বিক্রিও করতে পারে না। বিষয়টি আমার কাছে কেউ বিস্তারিত জানালে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

 

এলাকার সচেতন মহলের দাবি, সরকারি ঘর বিক্রির সঙ্গে জড়িত সচ্ছল ব্যক্তি এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো চক্রকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক এবং নিম্নমানের কাজের সাথে জড়িত ঠিকাদার ও কর্মকর্তাদের তদন্ত করে আইনের আওতায় আনা হোক।