চলনবিলবেষ্টিত নাটোরের সিংড়া উপজেলার চৌগ্রাম ইউনিয়নে অবস্থিত হুলহুলিয়া গ্রাম যেন বাস্তবের এক রূপকথা। নিজস্ব গঠনতন্ত্রে পরিচালিত এই গ্রামে নেই বাল্যবিবাহ, নেই মামলা-মোকদ্দমা, এমনকি শত বছরের ইতিহাসে একবারও পুলিশ ঢুকতে হয়নি গ্রামে। গ্রামবাসীরাই নিজেদের সমস্যা নিজেরা সমাধান করেন।
জেলা সদর নাটোর থেকে প্রায় ৩৭ কিলোমিটার দূরে আটটি পাড়া নিয়ে গড়ে ওঠা হুলহুলিয়া গ্রামের আয়তন প্রায় ২ দশমিক ১৫ বর্গকিলোমিটার। প্রায় ছয় হাজার মানুষের বসবাস এই গ্রামে। এর মধ্যে চার হাজারের বেশি মানুষ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে নিয়োজিত রয়েছেন।
সংকট থেকেই আদর্শের পথে যাত্রা
একসময় চলনবিল ছিল অথৈ পানির এক বিশাল জলাভূমি। বর্ষায় বিলভর্তি পানি, ঢেউ আর বন্যার সঙ্গে লড়াই করেই জীবন কাটত এখানকার মানুষের। তখন বছরে একবার আমন ধানই ছিল প্রধান ফসল। ১৯১৪-১৫ সালের ভয়াবহ বন্যায় হুলহুলিয়া গ্রামের ফসল নষ্ট হয়ে গেলে চরম অভাবে পড়ে গ্রামবাসী।
সেই সংকটই বদলে দেয় গ্রামের ভবিষ্যৎ। গ্রামের মাতবর মছির উদ্দিন মৃধার উদ্যোগে এক সভায় সিদ্ধান্ত হয়—যাদের ঘরে অতিরিক্ত ধান-বীজ আছে, তারা বিনাশর্তে অন্যদের ধার দেবেন। এই ঐক্যের ফলেই আবার সব জমিতে ফসল ফিরে আসে।
এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘হুলহুলিয়া সামাজিক উন্নয়ন পরিষদ’। ওই বছরই গ্রাম পরিচালনার জন্য প্রণয়ন করা হয় লিখিত সংবিধান, যা আজও কার্যকর।
নিজস্ব বিচারব্যবস্থা, নেই আদালত-পুলিশের প্রয়োজন
হুলহুলিয়া সামাজিক উন্নয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আল তৌফিক পরশ জানান, গ্রামের কোনো সমস্যার সমাধান ধাপে ধাপে করা হয়—প্রথমে পরিবার, পরে পাড়া কমিটি এবং সর্বশেষ সামাজিক উন্নয়ন পরিষদ। পরিষদের সিদ্ধান্ত সবাই মেনে নেন। ফলে আদালত কিংবা পুলিশের প্রয়োজন পড়ে না। এটি গত শত বছরের প্রথা।
গ্রামের আটটি পাড়ায় রয়েছে আলাদা ‘নিম্ন আদালত’ কমিটি। সামাজিক উন্নয়ন পরিষদে রয়েছেন একজন চেয়ারম্যান, একজন ভাইস চেয়ারম্যানসহ ২১ সদস্য। দুই বছর পর পর গ্রামবাসীর ভোটে এই কমিটি নির্বাচিত হয়।
শিক্ষা ও শৃঙ্খলার অনন্য দৃষ্টান্ত
হুলহুলিয়া গ্রামে শতভাগ মানুষ শিক্ষিত। এখানে সব ছেলেমেয়ের জন্য এসএসসি পাস বাধ্যতামূলক। দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার দায়িত্ব নেয় দরিদ্র তহবিল কমিটি। চাকরি পাওয়ার পর সহায়তার অর্থ পরিশোধের নিয়ম রয়েছে।
গ্রামে রয়েছে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি উচ্চ বিদ্যালয়, একটি মাদরাসা ও একটি মসজিদ। গ্রামবাসীর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একটি গ্রামে একটি মসজিদ ও একটি কবরস্থানই থাকবে—যাতে বিভক্তি তৈরি না হয়।
এই গ্রাম থেকে বের হয়েছেন দুই শতাধিক প্রকৌশলী, শতাধিক এমবিবিএস ডাক্তার, ১৭ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, ১১ জন বিচারকসহ অসংখ্য গুণীজন।

সামাজিক সংগঠন ও ডিজিটাল হাব
গ্রামের উন্নয়নে কাজ করছে ‘শেকড়’ ও ‘বটবৃক্ষ’ নামের দুটি অরাজনৈতিক সামাজিক সংগঠন। এসব সংগঠনের অনুদানে শিক্ষাবৃত্তি, কর্মসংস্থান ও অসহায়দের সহায়তা দেওয়া হয়।
২০১৬ সালে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতায় প্রায় ২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় হুলহুলিয়া ডিজিটাল হাব। এখানে রয়েছে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, ইসিজি সেবা ও একটি নিজস্ব ওয়েবসাইট।
প্রশাসনের স্বীকৃতি
সিংড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, “হুলহুলিয়া গ্রামে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অত্যন্ত সন্তোষজনক। তারা নিজেরাই সবকিছু সামলে নেয়।”
সিংড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, “হুলহুলিয়া গ্রাম আদর্শ গ্রাম হিসেবে পরিচিত। মামলা-মোকদ্দমা ছাড়াই নিজেদের সমস্যা সমাধান করা সত্যিই প্রশংসনীয়।”
গ্রামবাংলার বুকেই গড়ে ওঠা হুলহুলিয়া আজ প্রমাণ করে—ঐক্য, শিক্ষা ও শৃঙ্খলা থাকলে একটি গ্রামই হয়ে উঠতে পারে জাতির জন্য আদর্শ মডেল।

সিংড়া প্রতিনিধি 



















