ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

এক নজরে বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ও ব্যক্তিজীবন

  • অনলাইন ডেস্ক
  • প্রকাশের সময় : ১০:১৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫
  • 130
blank

বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) সকাল ৬টায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। দীর্ঘদিন ধরে নানা জটিলতায় ভুগছিলেন এই প্রবীণ রাজনৈতিক নেতা।

খালেদা জিয়ার মৃত্যু সংবাদটি নিশ্চিত করেন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক এবং বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন।

জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়

বিএনপির দলীয় ওয়েবসাইট অনুযায়ী, বেগম খালেদা জিয়ার জন্ম সাল ১৯৪৬। তবে ‘নন্দিত নেত্রী: খালেদা জিয়া’ শীর্ষক গ্রন্থে তার উপ-প্রেস সচিব সৈয়দ আবদাল আহমেদ উল্লেখ করেন, তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট। অবিভক্ত ভারত উপমহাদেশের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুঁড়ি জেলার নয়াবস্তি এলাকায় তার জন্ম। গ্রন্থটির মুখবন্ধ লিখেছেন প্রয়াত অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ।

গ্রন্থে আবদাল আহমেদ লেখেন, “তখন শরতের স্নিগ্ধ ভোর। নতুন শিশুর আগমনে পরিবারের সবাই আনন্দিত।”

খালেদা জিয়ার পারিবারিক নাম খালেদা খানম। ডাকনাম ছিল পুতুল। পারিবারিকভাবে তাকে টিপসি ও শান্তি নামেও ডাকা হতো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী শান্তির আকাঙ্ক্ষার আবহেই চিকিৎসক অবনী গুহ নিয়োগী সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুটির নাম রাখেন ‘শান্তি’। পরে মেঝো বোন সেলিনা ইসলামের দেওয়া ‘পুতুল’ নামটিই স্থায়ী হয়ে যায়।

তার পৈতৃক বাড়ি ফেনীর ফুলগাজী উপজেলায়। বাবা ইস্কান্দর মজুমদার ও মা বেগম তৈয়বা মজুমদারের সন্তানদের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে বর্তমানে এক বোন ও এক ভাই জীবিত আছেন। তিনি দুই সন্তানের জননী—বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান পিনো এবং প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকো।

রাজনৈতিক জীবনের সূচনা

বিএনপি চেয়ারপারসনের মিডিয়া উইং সদস্য শায়রুল কবির খান জানান, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী হিসেবে জীবনের দীর্ঘ সময় কাটান খালেদা জিয়া। ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৮৩ সালের মার্চে হন দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং একই বছরের ১ এপ্রিল দলের বর্ধিত সভায় প্রথম বক্তৃতা দেন।

বিচারপতি আবদুস সাত্তার অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে আনুষ্ঠানিকভাবে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন খালেদা জিয়া।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব

খালেদা জিয়া ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে তিনবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ের মাধ্যমে পঞ্চম সংসদে প্রধানমন্ত্রী হয়ে তিনি রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা বাতিল করে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন করেন।

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর এক মাস ষষ্ঠ সংসদের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিনি। পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের পর অনুষ্ঠিত সপ্তম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি পরাজিত হলে তিনি বিরোধী দলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেন।

২০০১ সালে চারদলীয় ঐক্যজোটের নেতৃত্ব দিয়ে তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করেন খালেদা জিয়া। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর আবারও বিরোধী দলীয় নেতা হন তিনি।

কারাবরণ ও মুক্তি

২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ৩ সেপ্টেম্বর কারাবরণ করেন খালেদা জিয়া। পরের বছর ১১ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্তি পান।
১/১১-পরবর্তী সময়ে দায়ের করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ২০১৮ সালে তার পাঁচ বছরের সাজা হয়, যা পরে বাড়িয়ে ১০ বছর করা হয়। তাকে পুরান ঢাকার পরিত্যক্ত কারাগারে রাখা হয় এবং পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়।

২০২০ সালের ২৫ মার্চ করোনাভাইরাস মহামারির সময় শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পান তিনি। দফায় দফায় মুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রপতির আদেশে ৬ আগস্ট তিনি পূর্ণ মুক্তি পান।

শেষ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড

বিএনপির মিডিয়া উইং জানায়, খালেদা জিয়া সর্বশেষ ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন এবং ত্রাণ বিতরণ করেন।
২০১৮ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি তিনি শেষ সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন। সর্বশেষ সমাবেশ করেন ২০১৭ সালেই।

রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে গণতন্ত্র, সংসদীয় শাসনব্যবস্থা ও বিরোধী রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দেশের রাজনীতিতে এক যুগের অবসান হলো। তার মৃত্যুতে রাজনৈতিক অঙ্গনসহ দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

জনপ্রিয় খবর
blank

প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটিতে ‘উইনটার কার্নিভাল অ্যান্ড পৌষ পার্বণ’ অনুষ্ঠিত

এক নজরে বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ও ব্যক্তিজীবন

প্রকাশের সময় : ১০:১৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫
blank

বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) সকাল ৬টায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। দীর্ঘদিন ধরে নানা জটিলতায় ভুগছিলেন এই প্রবীণ রাজনৈতিক নেতা।

খালেদা জিয়ার মৃত্যু সংবাদটি নিশ্চিত করেন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক এবং বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন।

জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়

বিএনপির দলীয় ওয়েবসাইট অনুযায়ী, বেগম খালেদা জিয়ার জন্ম সাল ১৯৪৬। তবে ‘নন্দিত নেত্রী: খালেদা জিয়া’ শীর্ষক গ্রন্থে তার উপ-প্রেস সচিব সৈয়দ আবদাল আহমেদ উল্লেখ করেন, তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট। অবিভক্ত ভারত উপমহাদেশের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুঁড়ি জেলার নয়াবস্তি এলাকায় তার জন্ম। গ্রন্থটির মুখবন্ধ লিখেছেন প্রয়াত অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ।

গ্রন্থে আবদাল আহমেদ লেখেন, “তখন শরতের স্নিগ্ধ ভোর। নতুন শিশুর আগমনে পরিবারের সবাই আনন্দিত।”

খালেদা জিয়ার পারিবারিক নাম খালেদা খানম। ডাকনাম ছিল পুতুল। পারিবারিকভাবে তাকে টিপসি ও শান্তি নামেও ডাকা হতো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী শান্তির আকাঙ্ক্ষার আবহেই চিকিৎসক অবনী গুহ নিয়োগী সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুটির নাম রাখেন ‘শান্তি’। পরে মেঝো বোন সেলিনা ইসলামের দেওয়া ‘পুতুল’ নামটিই স্থায়ী হয়ে যায়।

তার পৈতৃক বাড়ি ফেনীর ফুলগাজী উপজেলায়। বাবা ইস্কান্দর মজুমদার ও মা বেগম তৈয়বা মজুমদারের সন্তানদের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে বর্তমানে এক বোন ও এক ভাই জীবিত আছেন। তিনি দুই সন্তানের জননী—বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান পিনো এবং প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকো।

রাজনৈতিক জীবনের সূচনা

বিএনপি চেয়ারপারসনের মিডিয়া উইং সদস্য শায়রুল কবির খান জানান, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী হিসেবে জীবনের দীর্ঘ সময় কাটান খালেদা জিয়া। ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৮৩ সালের মার্চে হন দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং একই বছরের ১ এপ্রিল দলের বর্ধিত সভায় প্রথম বক্তৃতা দেন।

বিচারপতি আবদুস সাত্তার অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে আনুষ্ঠানিকভাবে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন খালেদা জিয়া।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব

খালেদা জিয়া ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে তিনবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ের মাধ্যমে পঞ্চম সংসদে প্রধানমন্ত্রী হয়ে তিনি রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা বাতিল করে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন করেন।

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর এক মাস ষষ্ঠ সংসদের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিনি। পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের পর অনুষ্ঠিত সপ্তম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি পরাজিত হলে তিনি বিরোধী দলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেন।

২০০১ সালে চারদলীয় ঐক্যজোটের নেতৃত্ব দিয়ে তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করেন খালেদা জিয়া। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর আবারও বিরোধী দলীয় নেতা হন তিনি।

কারাবরণ ও মুক্তি

২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ৩ সেপ্টেম্বর কারাবরণ করেন খালেদা জিয়া। পরের বছর ১১ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্তি পান।
১/১১-পরবর্তী সময়ে দায়ের করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ২০১৮ সালে তার পাঁচ বছরের সাজা হয়, যা পরে বাড়িয়ে ১০ বছর করা হয়। তাকে পুরান ঢাকার পরিত্যক্ত কারাগারে রাখা হয় এবং পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়।

২০২০ সালের ২৫ মার্চ করোনাভাইরাস মহামারির সময় শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পান তিনি। দফায় দফায় মুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রপতির আদেশে ৬ আগস্ট তিনি পূর্ণ মুক্তি পান।

শেষ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড

বিএনপির মিডিয়া উইং জানায়, খালেদা জিয়া সর্বশেষ ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন এবং ত্রাণ বিতরণ করেন।
২০১৮ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি তিনি শেষ সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন। সর্বশেষ সমাবেশ করেন ২০১৭ সালেই।

রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে গণতন্ত্র, সংসদীয় শাসনব্যবস্থা ও বিরোধী রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দেশের রাজনীতিতে এক যুগের অবসান হলো। তার মৃত্যুতে রাজনৈতিক অঙ্গনসহ দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।