আয়ুর্বেদ, প্রাচীন ভারতীয় চিকিৎসাশাস্ত্র, স্বাস্থ্য ও জীবনধারার প্রতি একটি পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে। শুধুমাত্র রোগ নিরাময়ে নয়, বরং রোগ প্রতিরোধ, মানসিক স্বাস্থ্য, শারীরিক সুস্থতা ও জীবনধারার সুষমতা বজায় রাখতে এই শাস্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের পাশাপাশি আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা আমাদের জীবনধারায় প্রাকৃতিক এবং দীর্ঘস্থায়ী সমাধান প্রদান করে।
বাংলাদেশে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার প্রসার এবং জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করেছেন একজন নিবেদিত প্রাণ চিকিৎসক, দেবজ্যোতি দত্ত। তিনি একই সাথে আয়ুর্বেদাচার্য ও এপিজেনেটিক্স বিশারদ হিসেবে সমাজে অমূল্য অবদান রাখছেন।
তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বায়োটেকনোলজি ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক শেষ করেন ২০১৬ সালে। তার শিক্ষাজীবন ছিল বিজ্ঞানভিত্তিক, কিন্তু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তাকে আয়ুর্বেদ এবং প্রাকৃতিক জীবনধারার প্রতি আকৃষ্ট করে। ছোট বেলা থেকেই তিনি অসুস্থ থাকতেন। প্রায় ১০–১২ বছর ধরে দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতার সঙ্গে সংগ্রাম করতে করতে তিনি উপলব্ধি করেন যে, প্রকৃতির নিজস্ব কিছু নিয়ম রয়েছে যা পৃথিবীর সকল প্রাণ তা অনুসরণ করে। মানুষ সেই নিয়মসকল কালের পরিক্রমায় ভুলতে বসেছে। তার ভুল খাদ্যাভ্যাস, প্রাকৃতিক নিয়মের ছন্দপতন, অনিয়মিত জীবনধারা এবং মানসিক অশান্তিই তার অসুস্থতার মূল কারণ।
নিজের অসুস্থতার মূলে পৌঁছানোর জন্য দেবজ্যোতি দত্ত আয়ুর্বেদ এবং প্রাকৃতিক জীবনধারার নীতিমালা অনুসন্ধান করতে শুরু করেন। তার সমাধানের খোঁজ করতে করতে তিনি আয়ুর্বেদ এর সন্ধান পান। আয়ুর্বেদ থেকে তিনি শিখেন কিভাবে খাদ্যাভ্যাস, জীবনধারা, মানসিক শান্তি এবং প্রাকৃতিক ঔষধ একসাথে মিলিয়ে শরীর ও মনকে সুস্থ রাখা যায়। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে আয়ুর্বেদিক জীবনধারার মাধ্যমে তিনি শারীরিকভাবে সুস্থ হয়ে ওঠেন। এই অভিজ্ঞতা তাকে আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের প্রতি তীব্র আকর্ষণ এবং নেশা দেয়।

২০১৮ সালে, চাকরিরত অবস্থায় তিনি আয়ুর্বেদের উপর পুনরায় সাড়ে ৫ বছরের আয়ুর্বেদ কোর্স এ গ্রাজুয়েশন করার জন্য ভারতের রাজস্থানের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ আয়ুর্বেদ (NIA, Rajasthan) যান। কঠোর অধ্যয়নের পর তিনি আয়ুর্বেদাচার্য হিসেবে দেশে ফিরে আসেন এবং তার অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান দিয়ে বাংলাদেশের মানুষকে স্বাস্থ্যসচেতন ও সুস্থ জীবনধারায় সাহায্য করতে শুরু করেন।
তার চিকিৎসা দর্শন একদম অনন্য। তিনি বিশ্বাস করেন, রোগের চেয়ে বড় সমাধান হলো সুস্থতা বজায় রাখা। আয়ুর্বেদ পদ্ধতিতে রোগ প্রতিরোধ এবং স্বাস্থ্য উন্নয়নের জন্য খাদ্য, জীবনধারা, যোগব্যায়াম, ধ্যান এবং প্রাকৃতিক ঔষধের ব্যবহারকে তিনি সমন্বয় করেন। এছাড়াও, তিনি এপিজেনেটিক্সের জ্ঞান ব্যবহার করে রোগের বংশগত প্রভাব এবং পরিবেশগত প্রভাবকে বোঝার মাধ্যমে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য পরিকল্পনা তৈরি করেন যা আধুনিক জেনেটিক বিজ্ঞান এবং প্রাচীন আয়ুর্বেদিক জ্ঞানের মিলনের একটি অনন্য উদাহরণ।
দেবজ্যোতি দত্ত শুধু চিকিৎসক হিসেবেই সীমাবদ্ধ নন। তিনি জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রচারের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছেন। তার লেখা “স্বাস্থ্য দর্পণ” বইটি সেই প্রচেষ্টার ফল। বইটিতে তিনি সহজ ভাষায় জীবনধারা, খাদ্যাভ্যাস, প্রাকৃতিক ঔষধ এবং আয়ুর্বেদিক নীতিমালা বর্ণনা করেছেন। ইতিমধ্যেই এই বই দেশের মধ্যে এবং বিদেশে ১,০০০ কপিরও বেশি বিক্রি হয়েছে। এই বইটি পাঠকদের জন্য একটি দিকনির্দেশনা, যার মাধ্যমে তারা নিজেরা স্বাস্থ্যকর জীবনধারার দিকে পদক্ষেপ নিতে পারেন।
বর্তমানে তিনি বাংলাদেশে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা এবং জনস্বাস্থ্য সচেতনতার জন্য বিভিন্ন কর্মশালা, সেমিনার ও স্বাস্থ্য ক্যাম্প পরিচালনা করছেন। তিনি রোগীদের সাথে সরাসরি কাজ করছেন এবং স্বাস্থ্য সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করে ব্যক্তিগত জীবনধারা পরিবর্তনের মাধ্যমে সুস্থতা নিশ্চিত করছেন। তার এই নিবেদিত প্রাণ প্রচেষ্টা শুধু রোগ নিরাময়ে নয়, বরং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
দেবজ্যোতি দত্তের কাজ প্রমাণ করে যে, আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা কেবল একটি প্রাচীন শাস্ত্র নয়, বরং আধুনিক জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কার্যকর ও প্রমাণিত স্বাস্থ্য পদ্ধতি। তিনি দীর্ঘকালীন রোগীদের সুস্থতার মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে, খাদ্য, জীবনধারা, মানসিক শান্তি এবং প্রাকৃতিক ঔষধের সঠিক সংমিশ্রণ রোগ প্রতিরোধ এবং সুস্থ জীবনধারা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এপিজেনেটিক্সের জ্ঞান ব্যবহার করে তিনি দেখান যে, আমাদের জেনেটিক প্রোগ্রাম শুধু আমাদের শারীরিক গঠন নির্ধারণ করে না, বরং জীবনধারা ও পরিবেশের মাধ্যমে স্বাস্থ্য এবং রোগের প্রবণতাও প্রভাবিত হয়।

বাংলাদেশে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার প্রসার ও জনপ্রিয়তার ক্ষেত্রে দেবজ্যোতি দত্তের অবদান অনন্য। একজন শিক্ষিত বিজ্ঞানী থেকে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক এবং এপিজেনেটিক্স বিশারদ হয়ে উঠা তার পথচলা, তীব্র অধ্যবসায়, জীবনের প্রতি আন্তরিকতা এবং মানুষের কল্যাণে অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
পরিশেষে বলা যায়, আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা শুধু রোগ নিরাময়ের মাধ্যম নয়; এটি জীবনধারার পরিবর্তন, স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং প্রাকৃতিক জীবনধারার প্রতি অনুপ্রেরণা।
তার অনন্য অবদান বাংলাদেশের মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবনধারাকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে এবং প্রমাণ করছে যে, বিজ্ঞান ও প্রাচীন জ্ঞানের সংমিশ্রণ সমাজের কল্যাণে কতটা কার্যকর হতে পারে। তার জীবন নিজেই একটি প্রেরণার গল্প।

মির্জা শফিকুল ইসলাম, বিশেষ প্রতিনিধি 
























