ছবির এই মানুষটির নাম মোঃ জিন্নত আলী। আমাদের জিন্নত স্যারের। একজন আদর্শ শিক্ষক। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে অবসর নিয়েছেন কয়েক বছর হলো।
আমি তখন কেবল ক্লাস ফাইভে উঠেছি। আমার মা আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন জিন্নত স্যারের কাছে আমাকে প্রাইভেট পড়াবেন। কারণ শিক্ষক হিসেবে তিনি তখন খুব জনপ্রিয় ছিলেন এবং সবাই মনে করতো তাঁর ছাত্র-ছাত্রীরা বৃত্তি পেয়ে থাকে। আমার মা স্যারের সাথে কথা বললেন। কিন্তু সমস্যা একটাই—স্যার খুব ব্যস্ত মানুষ। তাঁর অনেক ডিমান্ড, সময় বের করতে পারবেন না। আমার মা নাছোড়বান্দা। অবশেষে ঠিক হলো আমি তোফাজ্জল কাকার বাড়িতে গিয়ে তানভীর এবং তানিয়ার সাথে পড়বো। শুরু হলো আমার জীবনের প্রথম প্রাইভেট টিউটরের কাছে পড়া।
স্যার যেহেতু আমার স্কুলের শিক্ষক ছিলেন না, আমার প্রথম দিন একটু বিব্রত লাগছিলো। কিন্তু প্রথম দিনই আমি আবিষ্কার করলাম তাঁর অসাধারণ পড়ানোর স্টাইল, আন্তরিক ব্যবহার, ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং স্নেহ। আমি ছোটবেলা থেকেই খুব লক্ষ্মী মেয়ে ছিলাম, কোনদিন পড়ায় ফাঁকি দেইনি। আমি প্রতিদিন তানভীরদের বাড়ি যাই আর স্যারের কাছে পড়ি। খুব অল্প দিনেই আমি স্যারের খুব প্রিয় ছাত্রী হয়ে উঠলাম। স্যার এবার খোঁজ নিতে শুরু করলেন—আমার নিয়মিত দুধ খাওয়া হয় কিনা, ডিম খাওয়া হয় কিনা। বহুদিন শুনেছি, স্যার আমার মায়ের সাথে দেখা হলে বলতেন—আমাকে যেন প্রতিদিন এক গ্লাস দুধ খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা হয়।
স্যার ছিলেন একজন সৃজনশীল শিক্ষক। স্যার তাঁর নিজের ভাষায় রচনা লিখে দিতেন; সেই রচনা বাজারের বইয়ের রচনার থেকে আলাদা হতো। আমাকে আর তানভীরকে বর্ষাকাল রচনা লিখে দিলেন। তার মধ্যে একটু পরপরই ছন্দ দিতেন, যার একটি এখনো আমার মনে আছে—
বর্ষার সন্ধ্যায় গ্রাম্য মেয়ে
হাঁসের খোঁজে বাঁশঝাড়ে ছুটে আর ছড়া কাটে—
“আয় আয় তই, তই, তই,
হাঁসগুলি কোথা গেলো?
কই কই কই?”
স্যারের কাছে আমি গণিত, ইংরেজিসহ পাঁচটা সাবজেক্ট পড়তাম। প্রতিটা বিষয়েই আমার অনেক কিছু জানা হলো এবং বছর শেষে আমি ট্যালেন্টপুলে বৃত্তিও পেলাম।
আমি তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি। স্যার আমাদের স্কুলে এলেন প্রধান শিক্ষক হিসেবে। আমার খুব আফসোস হতো—আমি থাকতে স্যার কেন আমাদের স্কুলে আসলেন না? স্যার স্কুলে এসেই অনেক উন্নয়নমূলক কাজ শুরু করলেন। স্যার উদ্যোগ নিলেন—স্কুলের চারদিকে গাছ লাগাবেন। গাছ আনা হলো। স্যার আমাকে ডাকলেন। বললেন—
“এদিকে আয়, এই গাছটা তুই লাগা। বড় হলে বলতে পারবি এই গাছটা তোর লাগানো।”
আমি পূর্বদিক থেকে চার নম্বর গাছটি লাগালাম। স্যার আমাকে সাহায্য করলেন। আমিও বড় হই, আমার গাছটিও বড় হয়। মাঝে মাঝে গাছটার কাছে যেতাম—দেখতে আমার গাছটা কেমন আছে। খুব নিজের মনে হতো। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বাড়িতে গেলেই গাছটার কাছে দাঁড়াতাম, ছুঁয়ে দেখতাম, স্যারের কথা স্মরণ করতাম। এখনো বাড়ি গেলে আমার গাছটার কাছে একবার হলেও যাই; একটু মমতায় ছুঁয়ে দেখি; স্যারের কথা মনে করি।
এখন আমি একজন শিক্ষক। আমি বুঝি—ছাত্রছাত্রীরাও শিক্ষকের কাছে চারাগাছের মতো। শিক্ষকের দায়িত্ব একটি চারাগাছকে পরম যত্নে বড় করা। একটি চারাগাছ যেমন উপযুক্ত পরিবেশে, পর্যাপ্ত আলো-বাতাসে তার শাখা-প্রশাখা মেলে ধরে, তেমনি শিক্ষকের জ্ঞানের আলোয় ছাত্র আলোকিত হয়; তার মেধা ও মননের শাখা-প্রশাখা চারদিকে বিস্তৃত হয়।
একদিন স্যার বললেন তাঁর একটা পাসপোর্ট সাইজের ছবি চাই। মা জিজ্ঞেস করলেন—ছবি দিয়ে কি হবে? স্যার বললেন—এই স্কুল থেকে যারা বৃত্তি পাবে তাদের ছবি অফিস রুমে টানানো থাকবে, যাতে বর্তমান ছাত্রছাত্রীরা দেখে উৎসাহ পায়। শেষ পর্যন্ত এই কাজটি আর করা হয়নি—কারণ স্যার খুব বেশিদিন আমাদের স্কুলে ছিলেন না। স্যারের বদলির খবর যেদিন শুনেছিলাম, খুব কষ্ট পেয়েছিলাম।
স্যারকে নিয়ে একটা মজার স্মৃতিও আছে—যেটা না বললে কথা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তানভীর প্রায়ই পড়া শিখতো না, মাঝে মাঝে অংকে হিসাব ভুল করতো। স্যার এক অদ্ভুত শাস্তি দিতেন—তানভীরের পেটের চামড়াটা টেনে আবার ছেড়ে দিতেন। ঠিক যেন প্লাস্টিকের বেলুন! আর তানভীরও অদ্ভুত এক মুখভঙ্গি করতো। আমার চোখের সামনে এখনো সেই দৃশ্য ভেসে ওঠে; আর আমি হো হো করে হেসে উঠি। কি মজার ছিল সেই দিনগুলি!!
স্যার খুব স্মার্ট মানুষ ছিলেন। স্যারকে দেখতাম সবসময় স্যুট-টাই পরিহিত। কোথাও কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হলে স্যার উপস্থাপনা করতেন। কি যে সুন্দর করে কথা বলতেন! কি চমৎকার তাঁর বাচনভঙ্গি! কি নাটকীয়তা ছিল তাঁর কথায়! আমার খুব গর্ব হতো—আমি স্যারের ছাত্রী ছিলাম বলে। খুব ইচ্ছে হতো—আমি যদি স্যারের মতো শিক্ষক হতে পারতাম!
অনেকদিন স্যারের সাথে আমার দেখা হয় না। চাকরি হওয়ার পর আর দেখা হয়নি—নিজের ব্যস্ত জীবন। শুনেছি স্যারের সহধর্মিণী মারা গেছেন। শুনেছি স্যার অবসর নিয়েছেন। শুনেছি স্যারের ছোট ভাই মারা গেছেন। দূর থেকে শুনে শুধু আফসোস করেছি। এতটা আত্মকেন্দ্রিক ও স্বার্থপর ছাত্রী আমি—যিনি আমার আদর্শ, যিনি আমাকে একটি চারাগাছের মতো যত্ন করে আলোকিত পৃথিবীতে নিজেকে মেলে ধরার সুযোগ করে দিয়েছেন—তাঁর পাশে বসে দুটো সান্ত্বনা বা ভরসার বানী শোনাতে পারিনি। ভাবলেই লজ্জা লাগে; নিজেকে খুব ধিক্কার দিতে ইচ্ছে করে। নিজের বাবা হলে নিশ্চয়ই এমনটা করতাম না।
আজ আমি আর শিরীন ভাবী গিয়েছিলাম স্যারের সাথে দেখা করতে। স্যারের বয়স এখন ৭১ বছর। কোমরে ব্যথা। বুঝতে পারলাম—শার্টের নিচে বেল্ট পরে আছেন। হাঁটতেও একটু কষ্ট হচ্ছে; চুল-দাড়িতে মেহেদির রং। আমার সেই এভারগ্রিন স্যারকে এভাবে দেখবো—আমি কল্পনাও করিনি। স্যার নিজেই বললেন—তাঁর বয়স হয়েছে ৭১; ছোট দুই ভাই মারা গেছেন। এ যেন নিয়তির কাছে আত্মসমর্পণ করা। আমার কেন জানি মানতে কষ্ট হচ্ছে। আমি স্যারকে এখনো মাইক হাতে দেখতে চাই; তাঁর সেই সুনিপুণ বাচনভঙ্গির ছন্দে শ্রোতারা আবারও মুগ্ধ হবে—এই আশাই করি।
স্যারকে যতটুকু দেখেছি, মনে হয়েছে—তাঁর বিনোদনের খুব অভাব। এ যেন কেবলই বেঁচে থাকার জন্য বেঁচে থাকা। খুব আফসোস হচ্ছে—যদি আমাদের স্কুলের খেলায় স্যারকে আনা যেতো! যদি কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যেতো! স্যার অল্প সময়ের জন্য হলেও খুব ভালো বোধ করতেন। গ্রামে যারা ছোট ভাইবোন আছো, তাদের কাছে অনুরোধ—তোমরা একটু স্যারের দিকে খেয়াল রেখো।
অনেক দেরিতে হলেও যেহেতু স্যারের সাথে আমার আবার যোগাযোগ হয়েছে, নিশ্চয়ই স্যারের খোঁজ রাখবো। কেউ না থাকুক, আমি আপনার পাশে আছি, স্যার।
আপনি অনেক দিন বেঁচে থাকুন আমাদের মাঝে—বীরের মতো, এভারগ্রিন হয়ে, আমাদের আদর্শ হয়ে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের সহযোগি অধ্যাপক নাসরিন সুলতানার ফেসবুক ওয়াল থেকে –

স্টাফ রিপোর্টার 

























