ঢাকা সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
অধ্যক্ষ এম এ হামিদের ২০ তম মৃত্যুবার্ষিকী

আমাদের কীর্তিমান আব্বা

  • জিনাত আরা
  • প্রকাশের সময় : ০২:১৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬
  • 40
blank

মানুষ বেঁচে থাকে তার কর্মের মাধ্যমে। কীর্তিমানের মৃত্যু নেই—এই কথাটি আমার আব্বার কথা মনে হলেই আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করি। আমাদের কাছে তিনি ছিলেন শুধু একজন বাবা নন, তিনি ছিলেন আমাদের পরিবারের বটবৃক্ষ, আমাদের আদর্শ, আর চলনবিলের মানুষের কাছে ছিলেন একজন দরদী, একজন আশ্রয়দাতা ও নির্ভরতার প্রতীক।

আমার আব্বা এম এ হামিদ, জন্ম ১ মার্চ ১৯৩০। তিনি ছিলেন রসায়নের অধ্যাপক, অধ্যক্ষ, সাংবাদিক, লেখক ও সমাজসেবক। কর্মজীবনে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু তাঁর পরিচয় কেবল একজন কলেজ শিক্ষকের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। শিক্ষা বিস্তার, সমাজসেবা ও এলাকার উন্নয়নের জন্য তিনি নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। তাঁর উদ্যোগে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, ক্লাব, পোস্ট অফিস, হাসপাতাল ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নসহ বহু কাজ হয়েছে। খুবজীপুরের জাদুঘরও তাঁর উল্লেখযোগ্য উদ্যোগের একটি। তিনি ২৬টি বই লিখেছেন। এর মধ্যে কিছু আছে শিক্ষামূলক,বায়োগ্রাফিক্যাল, ধর্মীয় ও ভ্রমনকাহিনী নির্ভর। ভ্রমনপ্রিয় আব্বা তাঁর জীবদ্দশায় ৮/ ১০টি দেশ ভ্রমন করেছিলেন এবং সেসব দেশ নিয়ে লিখেছেন। যা পড়ে সে দেশ সম্পর্কে আমরা সম্যক ধারণা অর্জন করতে পারি। আব্বার জীবনটাই ছিল কর্মময়। দেশ ও দশের কল্যাণ সাধনে নিবেদিতপ্রাণ আব্বা সমাজসেবার স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন সম্মাননা ও পুরস্কার লাভ করেছেন। ২০০২ সালে American Biographical Center তাঁকে “Man of the Year” নির্বাচিত করে। তৎকালীন পাকিস্তান সরকারও তাঁকে সমাজসংস্কারক হিসেবে তমঘায়ে খেদমত ( টি কে) খেতাবে ভূষিত করেছিল। তৎকালীন  পরিচিতজনরা আব্বাকে এম এ হামিদ, টি কে নামেই চিনতেন।

blank

আব্বার কর্মজীবন নিয়ে অনেকেই অনেক কিছু লিখেছেন। তাই আজ তিনি বাবা হিসেবে কেমন ছিলেন, কেমন ছিল আব্বার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন তা তুলে ধরতে চাইছি।

আব্বা ছিলেন অত্যন্ত পরোপকারী ও দয়ালু মানুষ। মানুষের উপকার করাকে তিনি জীবনের ব্রত হিসেবে নিয়েছিলেন। কেউ কোনো প্রয়োজনে তাঁর কাছে এলে সাধ্যমতো সাহায্য করার চেষ্টা করতেন। কাউকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিতেন না। অনেক সম্পদশালী পরিবারের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও তাঁর জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত সাদামাটা। ছাত্রজীবনে আমার দাদা তাঁকে পড়াশোনার জন্য দুই হাত ভরে টাকা দিতেন। কিন্তু আব্বা নিজের জন্য খুব অল্পই খরচ করতেন; বাকি টাকা দরিদ্র বন্ধু ও পরিচিতজনদের জন্য ব্যয় করতেন। অর্থ-সম্পদের প্রতি তাঁর কোনোদিনও মোহ ছিল না। কর্মজীবনেও তিনি কখনো ব্যক্তিগত আর্থিক লাভকে প্রাধান্য দেননি। এমনকি স্কয়ারে কেমিস্ট হিসেবে কাজ করার সুযোগ থাকলেও, সেই চাকরি ধরে রাখলে হয়তো প্রচুর অর্থের মালিক হতে পারতেন। কিন্তু দেশ ও মানুষের সেবা তাঁর কাছে অর্থের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাই তিনি সে চেষ্টা করেননি।

শিক্ষক হিসেবে আব্বা কখনো প্রাইভেট পড়াতেন না। অথচ তিনি ছিলেন রসায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের শিক্ষক। ছাত্রছাত্রীরা অনেক অনুরোধ করলেও তিনি রাজি হতেন না। তিনি চাইলে প্রাইভেট পড়িয়ে প্রচুর অর্থ উপার্জন করতে পারতেন। কিন্তু তাঁর কাছে শিক্ষকতা ছিল মানুষ গড়ার দায়িত্ব, অর্থ উপার্জনের মাধ্যম নয়।

আব্বা দেশ ও দশের কল্যাণে এতটাই ব্যস্ত থাকতেন যে সংসারের জন্য আলাদা সময় দেওয়া তাঁর পক্ষে সবসময় সম্ভব হতো না। বলতে গেলে আমরা আব্বাকে খুব কমই কাছে পেয়েছি। তাঁর জীবনটাই যেন ছিল সবার জন্য উৎসর্গীকৃত। তবে আমাদের পড়াশোনা, ভবিষ্যৎ ও মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার ব্যাপারে তাঁর অবদান ছিল অনস্বীকার্য। । আমরা ছোটবেলা থেকেই জানতাম—আমাদের লেখাপড়া করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। এজন্য আব্বার ইচ্ছা পূরণে  আমরা কখনও অবহেলা করিনি। বলতে গেলে আমাদের গোটা পরিবারের সবার মনে লেখাপড়ার বীজ আব্বাই বপন করেছিলেন। আব্বা ছিলেন আমাদের জীবন গঠনের নেপথ্যের কারিগর ও পরিকল্পনাকারী।

blank

স্কুল-কলেজে পড়ার সময় কোনো পড়া বুঝতে না পারলে আব্বার কাছে যেতাম। আব্বা এত সুন্দর করে বুঝিয়ে দিতেন যে বিষয়টি সহজ হয়ে যেত। আমার কোনো লেখায় একটি ফুলস্টপের ভুলও আব্বার দৃষ্টি এড়াতো না। সেই ছোট্ট ভুলটিও তিনি ঠিক করে দিতেন দেখে অবাক হতাম। আজ বুঝি, তাঁর সেই সূক্ষ্ম নজর আর শাসনের মধ্যেও ছিল গভীর ভালোবাসা আর যত্ন।

আমাদের বাড়িতে ছোটবেলা থেকেই ধর্মীয় পরিবেশ বিরাজমান ছিল। আব্বা তাঁর জীবদ্দশায় দুবার হজ্বব্রত  পালন করেছেন—প্রথমবার চল্লিশ বছর বয়সে এবং শেষ জীবনে আমার আম্মাকে সঙ্গে নিয়ে আবার হজ্ব করেন। তিনি ধর্মের নিয়মকানুন নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতেন। তাঁর দেখাদেখি আমরাও ছোটবেলা থেকেই নামাজ, রোজা ও কোরআন পড়ে বড় হয়েছি। তবে তাঁর ধর্মীয় জীবন ছিল উদার ও আধুনিক চিন্তাধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আমাদের নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে, কারও মুখাপেক্ষী হওয়া যাবে না—এটাই ছিল তাঁর স্বপ্ন। ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি,ধর্মীয় গোঁড়ামি তাঁর মধ্যে কখনো দেখিনি।

আব্বা শুধু নিজের সন্তানদের নয়, আশপাশের শিশুদেরও খুব ভালোবাসতেন। আমাদের পাড়ার তিনি যেন সবার কমন দাদু ছিলেন। পাড়ার বাচ্চাদের সঙ্গে মাঠে খেলতেন। কোথাও গেলে তাঁর সঙ্গে কোনো না কোনো শিশুকে দেখা যেত। তাঁর মনটা ছিল শিশুর মতো সরল। পথে-ঘাটে অপরিচিত মানুষের সঙ্গেও সহজেই বন্ধুত্ব করে ফেলতেন। সেই সময় মোবাইল ফোন বা ফেসবুক ছিল না। কিন্তু তাঁর বুক পকেটে থাকত মানুষের নাম-ঠিকানা লেখা একটি ডায়েরি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যখন যেখানে গেছেন তিনি মানুষের সঙ্গে পরিচিত হতেন, ঠিকানা বিনিময় করতেন এবং পরে তাঁদের সঙ্গে আত্মীয়ের মতো সম্পর্ক বজায় রাখতেন। আমাদের অপরিচিত অনেককেই আমাদের আব্বাকে বাবা বলে সম্বোধন করতে দেখেছি। আমরা যে কত অবাক হতাম যখন দেখতাম গ্রামের অপরিচিত মানুষ বলতেন আপনার আব্বা আমাকে মেয়ের মত দেখতেন বা ছেলের মত দেখতেন, তাই আমরা তাকে আব্বা বলে ডাকি। ওনাদের অধিকার নিয়ে আব্বা ডাকা, আচার ব্যবহার দেখলে মনে হতো আব্বা যেন তাঁদেরই বাবা।

আব্বার নিজস্ব কিছু পছন্দ-অপছন্দের বিষয় ছিল। যেমন বাজার করা তিনি একেবারেই পছন্দ করতেন না। বলতেন, “বাজার করা সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি।” চাকরিজীবনে কলেজের পিয়ন বাজার করে দিতেন। অবসর নেওয়ার পর বাধ্য হয়ে নিজেকেই বাজার করতে হতো। বাজার থেকে ঘেমে-নেয়ে ফিরে এলে তাঁকে দেখে আমাদেরই কষ্ট হতো।

আব্বা ঝাল খেতে পারতেন না। তরকারীতে একটু বেশি ঝাল হলে আব্বার কপাল ঘেমে যেতো,চোখ দিয়ে পানি পড়তো। পরবর্তীতে আব্বা আমেরিকা বেড়াতে গিয়ে চিকিৎসা করতে যেয়ে আব্বার দাঁতে গুরুতর সমস্যা ধরা পড়ে। আব্বার ২৬টা দাঁত তুলে ফেলে নতুন করে বাঁধাই করা হয়। এ ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ তুলনা করে আমরা দেখলাম, আব্বার একএকটি দাঁতের চিকিৎসা খরচ এক ভরি সোনার সমান। দেশে ফিরে আব্বা মজা করে বলতেন আমার সোনার দাঁত। আমার এক একটি দাঁত এক ভরি সোনা! মৃত্যু পর্যন্ত আব্বা ঐ বাঁধানো দাঁত নিয়েই খাওয়াদাওয়া করেছেন।

আবার আব্বা সারা জীবন চৌকিতে ঘুমাতেন। আমরা সবাই খাটে ঘুমালেও তিনি খাট পছন্দ করতেন না। মজা করে বলতেন, “মৃত্যুর পরেই একেবারে খাটিয়ায় শুবো বাপু।” আব্বা আমাদের সবাইকে “বাপু” বলে ডাকতেন।

বাড়িতে আব্বার ঘরটি ছিল যেন একটি ছোট লাইব্রেরি। চারপাশে বইয়ের আলমারি, মাঝখানে লেখার টেবিল ও বিছানা। বাড়িতে থাকলে তাঁকে প্রায় সারাক্ষণ পড়তে বা লিখতে দেখা যেত। কখনো চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকলে বুঝতাম, লেখালেখি নিয়ে কোনো চিন্তায় আছেন। তাঁর কাগজপত্র বা বইখাতার প্রতি ছিল অন্যমাত্রার নজরদারী। আমরা যদি আব্বার ঘরে ঢুকে সেসব নাড়াচাড়া করতাম তিনি খুব বিরক্ত হতেন,রাগও করতেন। তাই আব্বা বাড়ির বাইরে গেলে আম্মা তাঁর ঘর সিটকিনি দিয়ে রাখতেন।

এত ব্যস্ততা, কাজ ও লেখালেখির মধ্যেও আব্বা ছিলেন অত্যন্ত হাসিখুশি ও আমুদে মানুষ। ছোটবেলায় আমরা তাঁর সঙ্গে  টেলিভিশনে নাটক সিনেমা দেখেছি। সিনেমার কোনো করুণ দৃশ্যে আব্বার চোখ দিয়ে পানি পড়ত, কখনো কখনো শিশুর মতো কাঁদতেন। আবার আমরা বোনেরা যখন সবাই মিলে আম্মাকে ঘিরে গল্প হাসাহাসি করতাম, আব্বা তাঁর ঘরে বসে লেখার ফাঁকে আমাদের নকল করে মুখ ভেংচাতেন শুধু আমাদের হাসানোর জন্য। আব্বার  এ কান্ড দেখে আমরা সবাই হেসে গড়িয়ে পড়তাম।

blank

আমাদের কোনো ভাই ছিল না। আমরা ছিলাম অনেকগুলো বোন। আব্বার স্বপ্ন ছিল তাঁর মেয়েদের ছেলের মতো যোগ্য করে গড়ে তোলা। তিনি কখনো আমাদের গায়ে হাত তোলেননি, এমনকি সেভাবে বকাঝকাও করেননি। আমাদের শিক্ষা, কর্মজীবন ও প্রতিষ্ঠার পেছনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। আজ আমাদের সন্তানরা যখন আফসোস করে বলে, “ইশ, নানুকে যদি আমরা আরও অনেকদিন কাছে পেতাম!তখন বুঝতে পারি, আব্বার প্রভাব শুধু তাঁর সন্তানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; পরবর্তী প্রজন্মও তাঁর গল্প শুনে তাঁর দ্বারা প্রভাবিত হতো। আসলেই আব্বাকে প্রয়োজন ছিল আরও বহুদিন আমাদের জীবনে, গ্রামবাসীর কল্যাণে, চলনবিলের  উন্নয়নে। বড় স্বল্প আয়ু দিয়ে আল্লাহ পাঠিয়েছিলেন আব্বাকে।

একটা ঘটনা মনে পড়তেই মনটা খারাপ হয়ে গেলো।আব্বার জীবনে এমন কিছু ঘটনাও ঘটেছে যেখানে তিনি মানুষের উপকার করতে গিয়ে নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পাবনায় আমাদের বাড়ির পাশে একটি বাগানঘেরা জায়গা তিনি কিনেছিলেন। আব্বা বগুড়া বদলি হয়ে গেলে, আমরা বগুড়ায় থাকাকালীন সেখানে একটি ঘর তুলে  দরিদ্র পরিবারকে বিনা ভাড়ায় থাকতে দিয়েছিলেন। পরে সেই ব্যক্তি জাল দলিল করে জায়গাটি নিজের বলে দখল করে নেয়। এমনকি আব্বার অবসরের পর আমরা পাবনায় ফিরে এলে একদিন তাঁর ছেলে সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে এসে আব্বাকে হুমকি দেয়। আব্বা যেন ঐ পরিবারকে কখনও উচ্ছেদ করবার চেষ্টা না করেন, তাহলে কিন্তু ভালো হবে না। সেই জায়গা আমরা কোনদিন ফিরে পাইনি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এত কিছুর পরও মানুষের প্রতি তাঁর মমতা কমেনি। কারণ তাঁর মন ছিল সমুদ্রের মতো বিশাল।

জীবনের শেষ চারটি বছর আব্বা স্ট্রোক করে প্যারালাইজড অবস্থায় ছিলেন। মৃত্যু পর্যন্ত  তিনি গ্রামেই থাকতেন, গ্রামের মানুষের কাছাকাছি। গ্রামের মানুষও আব্বাকে কাছে পেয়ে সেবা,সহমর্মিতা প্রকাশের সুযোগ পেয়েছিলেন। তাঁর জন্য দোয়া চাইলে তাঁরা বলতেন, “তোমার আব্বার জন্য দোয়া চাইতে হবে? তোমার আব্বা ছাড়া আমাদের জন্য করবার আছে কে? তিনি চলে গেলে আমাদের গ্রাম অন্ধকার হয়ে যাবে।” সেই চার বছরে আমরা নিজের সন্তান হয়ে যতটুকু সেবা করতে পেরেছি, তার চেয়েও বেশি ভালোবাসা, সেবা, দোয়া ও সহমর্মিতা দেখিয়েছেন গ্রামের মানুষ। কেউ তেল নিয়ে আসতেন, কেউ পানি পড়া।  কেউ এসে তেল মালিশ করে দিতেন, কেউ পানি খাওয়াতেন, কেউ সালাম করতেন, কেউ এসে কাঁদতেন।

blank

একবার দূরের এক গ্রামের একজন মানুষ স্বপ্নে তাঁর মৃত বাবাকে দেখেছিলেন। তাঁর বাবা নাকি বলেছিলেন, তাঁর গাছের প্রথম বেদানাটি যেন খুবজীপুর গ্রামের এম এ হামিদকে খাওয়ানো হয়। আশ্চর্যের বিষয়, সেই ব্যক্তি আব্বাকে চিনতেন না। পরদিন তিনি বেদানাটি নিয়ে খুঁজতে খুঁজতে খুবজীপুরে এসে আব্বাকে সেটি খাইয়ে যান। এমন আরও অনেক ঘটনা রয়েছে, যা আব্বার প্রতি মানুষের ভালোবাসার সাক্ষ্য বহন করে।

আব্বাকে আমাদের গ্রামের পাকা সড়কের পাশে কবর দেওয়া হয়েছে—যে সড়কটি গড়ে তোলার পেছনেও ছিল তাঁর উদ্যোগ ও শ্রম। সেই রাস্তা দিয়ে যখন আমরা চলাফেরা করি, মনে হয়, আব্বা কি তাঁর কবর থেকে দেখতে পাচ্ছেন—তাঁর হাতে গড়া সেই রাস্তা দিয়ে তাঁর সন্তান, নাতি-নাতনি আর গ্রামের মানুষ চলাচল করছে? আব্বা নিশ্চয়ই খুশি হচ্ছেন।

আব্বা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর স্বপ্নগুলো রয়ে গেছে। তাঁর কাজ, তাঁর আদর্শ, তাঁর মানুষের প্রতি ভালোবাসা—এসবই আমাদের জন্য রেখে যাওয়া সবচেয়ে বড় সম্পদ। আমরা চাই, নতুন প্রজন্ম আব্বাকে জানুক, তাঁর কর্ম ও আদর্শকে অনুসরণ করুক। তাঁর পরিচিতিমূলক বই নতুন প্রজন্মের হাতে পৌঁছাক, স্থানীয় পত্র-পত্রিকায় তাঁকে নিয়ে আরও লেখা হোক। কারণ আব্বা চেষ্টা করেছিলেন আমাদের জীবনকে সুন্দর করতে; এখন আমাদের দায়িত্ব তাঁকে মানুষের মাঝে অবিস্মরণীয় করে রাখা।

সবশেষে মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানাই—তিনি আমাদের এমন একজন মানুষকে বাবা হিসেবে দিয়েছিলেন, যিনি নিজের জীবনকে দেশ ও দশের কল্যাণে উৎসর্গ করেছিলেন। মহান আল্লাহ আমার আব্বার সকল ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন, তাঁর কবরকে নূরে ভরে দিন এবং তাঁর সকল নেক আমল কবুল করুন। তাঁকে বিনা হিসাবে জান্নাতুল ফেরদৌস নসীব করুন। আমিন।

সবাই আমার আব্বার জন্য দোয়া করবেন।

———————-

লেখিকাঃ মরহুমের ষষ্ঠ কন্যা

অধ্যক্ষ এম এ হামিদের ২০ তম মৃত্যুবার্ষিকী

আমাদের কীর্তিমান আব্বা

প্রকাশের সময় : ০২:১৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬
blank

মানুষ বেঁচে থাকে তার কর্মের মাধ্যমে। কীর্তিমানের মৃত্যু নেই—এই কথাটি আমার আব্বার কথা মনে হলেই আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করি। আমাদের কাছে তিনি ছিলেন শুধু একজন বাবা নন, তিনি ছিলেন আমাদের পরিবারের বটবৃক্ষ, আমাদের আদর্শ, আর চলনবিলের মানুষের কাছে ছিলেন একজন দরদী, একজন আশ্রয়দাতা ও নির্ভরতার প্রতীক।

আমার আব্বা এম এ হামিদ, জন্ম ১ মার্চ ১৯৩০। তিনি ছিলেন রসায়নের অধ্যাপক, অধ্যক্ষ, সাংবাদিক, লেখক ও সমাজসেবক। কর্মজীবনে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু তাঁর পরিচয় কেবল একজন কলেজ শিক্ষকের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। শিক্ষা বিস্তার, সমাজসেবা ও এলাকার উন্নয়নের জন্য তিনি নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। তাঁর উদ্যোগে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, ক্লাব, পোস্ট অফিস, হাসপাতাল ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নসহ বহু কাজ হয়েছে। খুবজীপুরের জাদুঘরও তাঁর উল্লেখযোগ্য উদ্যোগের একটি। তিনি ২৬টি বই লিখেছেন। এর মধ্যে কিছু আছে শিক্ষামূলক,বায়োগ্রাফিক্যাল, ধর্মীয় ও ভ্রমনকাহিনী নির্ভর। ভ্রমনপ্রিয় আব্বা তাঁর জীবদ্দশায় ৮/ ১০টি দেশ ভ্রমন করেছিলেন এবং সেসব দেশ নিয়ে লিখেছেন। যা পড়ে সে দেশ সম্পর্কে আমরা সম্যক ধারণা অর্জন করতে পারি। আব্বার জীবনটাই ছিল কর্মময়। দেশ ও দশের কল্যাণ সাধনে নিবেদিতপ্রাণ আব্বা সমাজসেবার স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন সম্মাননা ও পুরস্কার লাভ করেছেন। ২০০২ সালে American Biographical Center তাঁকে “Man of the Year” নির্বাচিত করে। তৎকালীন পাকিস্তান সরকারও তাঁকে সমাজসংস্কারক হিসেবে তমঘায়ে খেদমত ( টি কে) খেতাবে ভূষিত করেছিল। তৎকালীন  পরিচিতজনরা আব্বাকে এম এ হামিদ, টি কে নামেই চিনতেন।

blank

আব্বার কর্মজীবন নিয়ে অনেকেই অনেক কিছু লিখেছেন। তাই আজ তিনি বাবা হিসেবে কেমন ছিলেন, কেমন ছিল আব্বার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন তা তুলে ধরতে চাইছি।

আব্বা ছিলেন অত্যন্ত পরোপকারী ও দয়ালু মানুষ। মানুষের উপকার করাকে তিনি জীবনের ব্রত হিসেবে নিয়েছিলেন। কেউ কোনো প্রয়োজনে তাঁর কাছে এলে সাধ্যমতো সাহায্য করার চেষ্টা করতেন। কাউকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিতেন না। অনেক সম্পদশালী পরিবারের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও তাঁর জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত সাদামাটা। ছাত্রজীবনে আমার দাদা তাঁকে পড়াশোনার জন্য দুই হাত ভরে টাকা দিতেন। কিন্তু আব্বা নিজের জন্য খুব অল্পই খরচ করতেন; বাকি টাকা দরিদ্র বন্ধু ও পরিচিতজনদের জন্য ব্যয় করতেন। অর্থ-সম্পদের প্রতি তাঁর কোনোদিনও মোহ ছিল না। কর্মজীবনেও তিনি কখনো ব্যক্তিগত আর্থিক লাভকে প্রাধান্য দেননি। এমনকি স্কয়ারে কেমিস্ট হিসেবে কাজ করার সুযোগ থাকলেও, সেই চাকরি ধরে রাখলে হয়তো প্রচুর অর্থের মালিক হতে পারতেন। কিন্তু দেশ ও মানুষের সেবা তাঁর কাছে অর্থের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাই তিনি সে চেষ্টা করেননি।

শিক্ষক হিসেবে আব্বা কখনো প্রাইভেট পড়াতেন না। অথচ তিনি ছিলেন রসায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের শিক্ষক। ছাত্রছাত্রীরা অনেক অনুরোধ করলেও তিনি রাজি হতেন না। তিনি চাইলে প্রাইভেট পড়িয়ে প্রচুর অর্থ উপার্জন করতে পারতেন। কিন্তু তাঁর কাছে শিক্ষকতা ছিল মানুষ গড়ার দায়িত্ব, অর্থ উপার্জনের মাধ্যম নয়।

আব্বা দেশ ও দশের কল্যাণে এতটাই ব্যস্ত থাকতেন যে সংসারের জন্য আলাদা সময় দেওয়া তাঁর পক্ষে সবসময় সম্ভব হতো না। বলতে গেলে আমরা আব্বাকে খুব কমই কাছে পেয়েছি। তাঁর জীবনটাই যেন ছিল সবার জন্য উৎসর্গীকৃত। তবে আমাদের পড়াশোনা, ভবিষ্যৎ ও মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার ব্যাপারে তাঁর অবদান ছিল অনস্বীকার্য। । আমরা ছোটবেলা থেকেই জানতাম—আমাদের লেখাপড়া করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। এজন্য আব্বার ইচ্ছা পূরণে  আমরা কখনও অবহেলা করিনি। বলতে গেলে আমাদের গোটা পরিবারের সবার মনে লেখাপড়ার বীজ আব্বাই বপন করেছিলেন। আব্বা ছিলেন আমাদের জীবন গঠনের নেপথ্যের কারিগর ও পরিকল্পনাকারী।

blank

স্কুল-কলেজে পড়ার সময় কোনো পড়া বুঝতে না পারলে আব্বার কাছে যেতাম। আব্বা এত সুন্দর করে বুঝিয়ে দিতেন যে বিষয়টি সহজ হয়ে যেত। আমার কোনো লেখায় একটি ফুলস্টপের ভুলও আব্বার দৃষ্টি এড়াতো না। সেই ছোট্ট ভুলটিও তিনি ঠিক করে দিতেন দেখে অবাক হতাম। আজ বুঝি, তাঁর সেই সূক্ষ্ম নজর আর শাসনের মধ্যেও ছিল গভীর ভালোবাসা আর যত্ন।

আমাদের বাড়িতে ছোটবেলা থেকেই ধর্মীয় পরিবেশ বিরাজমান ছিল। আব্বা তাঁর জীবদ্দশায় দুবার হজ্বব্রত  পালন করেছেন—প্রথমবার চল্লিশ বছর বয়সে এবং শেষ জীবনে আমার আম্মাকে সঙ্গে নিয়ে আবার হজ্ব করেন। তিনি ধর্মের নিয়মকানুন নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতেন। তাঁর দেখাদেখি আমরাও ছোটবেলা থেকেই নামাজ, রোজা ও কোরআন পড়ে বড় হয়েছি। তবে তাঁর ধর্মীয় জীবন ছিল উদার ও আধুনিক চিন্তাধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আমাদের নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে, কারও মুখাপেক্ষী হওয়া যাবে না—এটাই ছিল তাঁর স্বপ্ন। ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি,ধর্মীয় গোঁড়ামি তাঁর মধ্যে কখনো দেখিনি।

আব্বা শুধু নিজের সন্তানদের নয়, আশপাশের শিশুদেরও খুব ভালোবাসতেন। আমাদের পাড়ার তিনি যেন সবার কমন দাদু ছিলেন। পাড়ার বাচ্চাদের সঙ্গে মাঠে খেলতেন। কোথাও গেলে তাঁর সঙ্গে কোনো না কোনো শিশুকে দেখা যেত। তাঁর মনটা ছিল শিশুর মতো সরল। পথে-ঘাটে অপরিচিত মানুষের সঙ্গেও সহজেই বন্ধুত্ব করে ফেলতেন। সেই সময় মোবাইল ফোন বা ফেসবুক ছিল না। কিন্তু তাঁর বুক পকেটে থাকত মানুষের নাম-ঠিকানা লেখা একটি ডায়েরি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যখন যেখানে গেছেন তিনি মানুষের সঙ্গে পরিচিত হতেন, ঠিকানা বিনিময় করতেন এবং পরে তাঁদের সঙ্গে আত্মীয়ের মতো সম্পর্ক বজায় রাখতেন। আমাদের অপরিচিত অনেককেই আমাদের আব্বাকে বাবা বলে সম্বোধন করতে দেখেছি। আমরা যে কত অবাক হতাম যখন দেখতাম গ্রামের অপরিচিত মানুষ বলতেন আপনার আব্বা আমাকে মেয়ের মত দেখতেন বা ছেলের মত দেখতেন, তাই আমরা তাকে আব্বা বলে ডাকি। ওনাদের অধিকার নিয়ে আব্বা ডাকা, আচার ব্যবহার দেখলে মনে হতো আব্বা যেন তাঁদেরই বাবা।

আব্বার নিজস্ব কিছু পছন্দ-অপছন্দের বিষয় ছিল। যেমন বাজার করা তিনি একেবারেই পছন্দ করতেন না। বলতেন, “বাজার করা সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি।” চাকরিজীবনে কলেজের পিয়ন বাজার করে দিতেন। অবসর নেওয়ার পর বাধ্য হয়ে নিজেকেই বাজার করতে হতো। বাজার থেকে ঘেমে-নেয়ে ফিরে এলে তাঁকে দেখে আমাদেরই কষ্ট হতো।

আব্বা ঝাল খেতে পারতেন না। তরকারীতে একটু বেশি ঝাল হলে আব্বার কপাল ঘেমে যেতো,চোখ দিয়ে পানি পড়তো। পরবর্তীতে আব্বা আমেরিকা বেড়াতে গিয়ে চিকিৎসা করতে যেয়ে আব্বার দাঁতে গুরুতর সমস্যা ধরা পড়ে। আব্বার ২৬টা দাঁত তুলে ফেলে নতুন করে বাঁধাই করা হয়। এ ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ তুলনা করে আমরা দেখলাম, আব্বার একএকটি দাঁতের চিকিৎসা খরচ এক ভরি সোনার সমান। দেশে ফিরে আব্বা মজা করে বলতেন আমার সোনার দাঁত। আমার এক একটি দাঁত এক ভরি সোনা! মৃত্যু পর্যন্ত আব্বা ঐ বাঁধানো দাঁত নিয়েই খাওয়াদাওয়া করেছেন।

আবার আব্বা সারা জীবন চৌকিতে ঘুমাতেন। আমরা সবাই খাটে ঘুমালেও তিনি খাট পছন্দ করতেন না। মজা করে বলতেন, “মৃত্যুর পরেই একেবারে খাটিয়ায় শুবো বাপু।” আব্বা আমাদের সবাইকে “বাপু” বলে ডাকতেন।

বাড়িতে আব্বার ঘরটি ছিল যেন একটি ছোট লাইব্রেরি। চারপাশে বইয়ের আলমারি, মাঝখানে লেখার টেবিল ও বিছানা। বাড়িতে থাকলে তাঁকে প্রায় সারাক্ষণ পড়তে বা লিখতে দেখা যেত। কখনো চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকলে বুঝতাম, লেখালেখি নিয়ে কোনো চিন্তায় আছেন। তাঁর কাগজপত্র বা বইখাতার প্রতি ছিল অন্যমাত্রার নজরদারী। আমরা যদি আব্বার ঘরে ঢুকে সেসব নাড়াচাড়া করতাম তিনি খুব বিরক্ত হতেন,রাগও করতেন। তাই আব্বা বাড়ির বাইরে গেলে আম্মা তাঁর ঘর সিটকিনি দিয়ে রাখতেন।

এত ব্যস্ততা, কাজ ও লেখালেখির মধ্যেও আব্বা ছিলেন অত্যন্ত হাসিখুশি ও আমুদে মানুষ। ছোটবেলায় আমরা তাঁর সঙ্গে  টেলিভিশনে নাটক সিনেমা দেখেছি। সিনেমার কোনো করুণ দৃশ্যে আব্বার চোখ দিয়ে পানি পড়ত, কখনো কখনো শিশুর মতো কাঁদতেন। আবার আমরা বোনেরা যখন সবাই মিলে আম্মাকে ঘিরে গল্প হাসাহাসি করতাম, আব্বা তাঁর ঘরে বসে লেখার ফাঁকে আমাদের নকল করে মুখ ভেংচাতেন শুধু আমাদের হাসানোর জন্য। আব্বার  এ কান্ড দেখে আমরা সবাই হেসে গড়িয়ে পড়তাম।

blank

আমাদের কোনো ভাই ছিল না। আমরা ছিলাম অনেকগুলো বোন। আব্বার স্বপ্ন ছিল তাঁর মেয়েদের ছেলের মতো যোগ্য করে গড়ে তোলা। তিনি কখনো আমাদের গায়ে হাত তোলেননি, এমনকি সেভাবে বকাঝকাও করেননি। আমাদের শিক্ষা, কর্মজীবন ও প্রতিষ্ঠার পেছনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। আজ আমাদের সন্তানরা যখন আফসোস করে বলে, “ইশ, নানুকে যদি আমরা আরও অনেকদিন কাছে পেতাম!তখন বুঝতে পারি, আব্বার প্রভাব শুধু তাঁর সন্তানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; পরবর্তী প্রজন্মও তাঁর গল্প শুনে তাঁর দ্বারা প্রভাবিত হতো। আসলেই আব্বাকে প্রয়োজন ছিল আরও বহুদিন আমাদের জীবনে, গ্রামবাসীর কল্যাণে, চলনবিলের  উন্নয়নে। বড় স্বল্প আয়ু দিয়ে আল্লাহ পাঠিয়েছিলেন আব্বাকে।

একটা ঘটনা মনে পড়তেই মনটা খারাপ হয়ে গেলো।আব্বার জীবনে এমন কিছু ঘটনাও ঘটেছে যেখানে তিনি মানুষের উপকার করতে গিয়ে নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পাবনায় আমাদের বাড়ির পাশে একটি বাগানঘেরা জায়গা তিনি কিনেছিলেন। আব্বা বগুড়া বদলি হয়ে গেলে, আমরা বগুড়ায় থাকাকালীন সেখানে একটি ঘর তুলে  দরিদ্র পরিবারকে বিনা ভাড়ায় থাকতে দিয়েছিলেন। পরে সেই ব্যক্তি জাল দলিল করে জায়গাটি নিজের বলে দখল করে নেয়। এমনকি আব্বার অবসরের পর আমরা পাবনায় ফিরে এলে একদিন তাঁর ছেলে সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে এসে আব্বাকে হুমকি দেয়। আব্বা যেন ঐ পরিবারকে কখনও উচ্ছেদ করবার চেষ্টা না করেন, তাহলে কিন্তু ভালো হবে না। সেই জায়গা আমরা কোনদিন ফিরে পাইনি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এত কিছুর পরও মানুষের প্রতি তাঁর মমতা কমেনি। কারণ তাঁর মন ছিল সমুদ্রের মতো বিশাল।

জীবনের শেষ চারটি বছর আব্বা স্ট্রোক করে প্যারালাইজড অবস্থায় ছিলেন। মৃত্যু পর্যন্ত  তিনি গ্রামেই থাকতেন, গ্রামের মানুষের কাছাকাছি। গ্রামের মানুষও আব্বাকে কাছে পেয়ে সেবা,সহমর্মিতা প্রকাশের সুযোগ পেয়েছিলেন। তাঁর জন্য দোয়া চাইলে তাঁরা বলতেন, “তোমার আব্বার জন্য দোয়া চাইতে হবে? তোমার আব্বা ছাড়া আমাদের জন্য করবার আছে কে? তিনি চলে গেলে আমাদের গ্রাম অন্ধকার হয়ে যাবে।” সেই চার বছরে আমরা নিজের সন্তান হয়ে যতটুকু সেবা করতে পেরেছি, তার চেয়েও বেশি ভালোবাসা, সেবা, দোয়া ও সহমর্মিতা দেখিয়েছেন গ্রামের মানুষ। কেউ তেল নিয়ে আসতেন, কেউ পানি পড়া।  কেউ এসে তেল মালিশ করে দিতেন, কেউ পানি খাওয়াতেন, কেউ সালাম করতেন, কেউ এসে কাঁদতেন।

blank

একবার দূরের এক গ্রামের একজন মানুষ স্বপ্নে তাঁর মৃত বাবাকে দেখেছিলেন। তাঁর বাবা নাকি বলেছিলেন, তাঁর গাছের প্রথম বেদানাটি যেন খুবজীপুর গ্রামের এম এ হামিদকে খাওয়ানো হয়। আশ্চর্যের বিষয়, সেই ব্যক্তি আব্বাকে চিনতেন না। পরদিন তিনি বেদানাটি নিয়ে খুঁজতে খুঁজতে খুবজীপুরে এসে আব্বাকে সেটি খাইয়ে যান। এমন আরও অনেক ঘটনা রয়েছে, যা আব্বার প্রতি মানুষের ভালোবাসার সাক্ষ্য বহন করে।

আব্বাকে আমাদের গ্রামের পাকা সড়কের পাশে কবর দেওয়া হয়েছে—যে সড়কটি গড়ে তোলার পেছনেও ছিল তাঁর উদ্যোগ ও শ্রম। সেই রাস্তা দিয়ে যখন আমরা চলাফেরা করি, মনে হয়, আব্বা কি তাঁর কবর থেকে দেখতে পাচ্ছেন—তাঁর হাতে গড়া সেই রাস্তা দিয়ে তাঁর সন্তান, নাতি-নাতনি আর গ্রামের মানুষ চলাচল করছে? আব্বা নিশ্চয়ই খুশি হচ্ছেন।

আব্বা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর স্বপ্নগুলো রয়ে গেছে। তাঁর কাজ, তাঁর আদর্শ, তাঁর মানুষের প্রতি ভালোবাসা—এসবই আমাদের জন্য রেখে যাওয়া সবচেয়ে বড় সম্পদ। আমরা চাই, নতুন প্রজন্ম আব্বাকে জানুক, তাঁর কর্ম ও আদর্শকে অনুসরণ করুক। তাঁর পরিচিতিমূলক বই নতুন প্রজন্মের হাতে পৌঁছাক, স্থানীয় পত্র-পত্রিকায় তাঁকে নিয়ে আরও লেখা হোক। কারণ আব্বা চেষ্টা করেছিলেন আমাদের জীবনকে সুন্দর করতে; এখন আমাদের দায়িত্ব তাঁকে মানুষের মাঝে অবিস্মরণীয় করে রাখা।

সবশেষে মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানাই—তিনি আমাদের এমন একজন মানুষকে বাবা হিসেবে দিয়েছিলেন, যিনি নিজের জীবনকে দেশ ও দশের কল্যাণে উৎসর্গ করেছিলেন। মহান আল্লাহ আমার আব্বার সকল ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন, তাঁর কবরকে নূরে ভরে দিন এবং তাঁর সকল নেক আমল কবুল করুন। তাঁকে বিনা হিসাবে জান্নাতুল ফেরদৌস নসীব করুন। আমিন।

সবাই আমার আব্বার জন্য দোয়া করবেন।

———————-

লেখিকাঃ মরহুমের ষষ্ঠ কন্যা