অন্ধকারের পর্দা সরিয়ে রাজধানীর পুব আকাশে যখন ভোরের আভা মাত্র উঁকি দিচ্ছে, রমনার বটমূল তখন কানায় কানায় পূর্ণ। লাল-সাদায় সজ্জিত উৎসবমুখর মানুষের পদচারণায় মুখরিত চারপাশ। বাঙালির আত্মপরিচয় আর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মিলনমেলায় পরিণত হয় এই প্রাঙ্গণ। ১৯৬৭ সাল থেকে প্রবহমান ঐতিহ্যের ধারা বজায় রেখে এবারও ছায়ানট বরণ করে নিল বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩-কে। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল বিশ্বকবির সেই কালজয়ী আহ্বান— ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’।
সকাল সোয়া ৬টায় সম্মেলক কণ্ঠে ‘জাগো আলোক-লগনে’ গানের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। অজয় ভট্টাচার্যের কাব্য ও ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের সুরে এই আবাহনী গানটি যেন আগামীর এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এরপর একে একে পরিবেশিত হয় রবীন্দ্র, নজরুল, দ্বিজেন্দ্রলাল ও লালন সাঁইয়ের গান।
মাকছুরা আখতার অন্তরা থেকে শুরু করে লাইসা আহমদ লিসাদের কণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীত যেমন স্নিগ্ধতা ছড়িয়েছে, তেমনি খায়রুল আনাম শাকিল ও শারমিন সাথী ইসলাম ময়নাদের কণ্ঠে নজরুলের গান এনে দিয়েছে দ্রোহ ও সাম্যের চেতনা। চন্দনা মজুমদারের কণ্ঠে লালনের আধ্যাত্মিক সুর উপস্থিত জনতাকে নিয়ে যায় এক গভীর ভাবালোকে।
প্রায় ২০০ শিল্পীর অংশগ্রহণে সংগীত, কবিতা ও সম্মেলক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে উচ্চারিত হয় মুক্তচিন্তার জয়গান। ‘ভয় হতে তব অভয় মাঝে’ কিংবা ‘পথে এবার নামো সাথী’—এমন প্রতিটি সুরই ছিল সামাজিক সংকীর্ণতা থেকে মুক্তির আহ্বান। গানের ফাঁকে খায়রুল আলম সবুজের কণ্ঠে সলিল চৌধুরীর ‘এক গুচ্ছ চাবি’ আবৃত্তি অনুষ্ঠানটিতে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। শিশু থেকে প্রবীণ—সব বয়সের মানুষের এই শৈল্পিক অংশগ্রহণ প্রজন্মের ব্যবধান ঘুচিয়ে তৈরি করে এক অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐক্য।
জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি টানার আগে সমাপনী বক্তব্য রাখেন ছায়ানটের সভাপতি সারওয়ার আলী। তাঁর বক্তব্যে ফুটে ওঠে সমকালীন অস্থিরতা ও অসহিষ্ণুতার চিত্র। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, পহেলা বৈশাখ কেবল একটি উৎসব নয়, বরং এটি বাঙালির জাতিসত্তা ও অস্তিত্বের এক বলিষ্ঠ প্রকাশ।
তিনি গভীর উদ্বেগের সাথে বলেন, “বর্তমানে সমাজে অসহিষ্ণুতা বাড়ছে, সংস্কৃতির ওপর বারবার আঘাত আসছে। গান ও সুর যা বাঙালির চিরকালের সঙ্গী, তাকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করার অপচেষ্টা চলছে।” বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ আর অশান্তির কথা উল্লেখ করে তিনি এমন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখার কথা বলেন, যেখানে জ্ঞান থাকবে মুক্ত এবং মানুষের মেরুদণ্ড থাকবে সোজা।
অসহিষ্ণু এই সময়ে ছায়ানটের এই আয়োজন কেবল প্রথাগত উৎসব ছিল না, বরং তা ছিল একটি নির্ভয়, শান্তিময় এবং মানবিক সমাজ গড়ার শপথ।

অনলাইন ডেস্ক 



















